💘💘আল্লাহর সঙ্গে বান্দার প্রেম💘💘

সৃষ্টির প্রথমদিন থেকেই প্রেম-ভালোবাসা মানবজীবনের অষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত। শুধু মানুষে মানুষে নয়। জড়বস্তু ছাড়া সমস্ত সৃষ্টিজীব, পশু-পাখির সাথে জড়িত। বিভিন্ন স্থানে, পরিস্থিতি-পরিবেশে বিভিন্ন সম্পর্কের বাঁধনে আবদ্ধ এ প্রেম-ভালোবাসা। কিন্তু প্রতিটি সম্পর্কের পেছনেই রয়েছে একটি উদ্দেশ্য। প্রয়োজন এবং উদ্দেশ্য ছাড়া কোনো সম্পর্ক দুনিয়াতে নেই। সম্পর্কটা ভালো-মন্দ যেমনই হোক না কেনো! সম্পর্কটা যদি সন্তানের সাথে মা-বাবার হয়, মা-বাবা চায় সন্তান বড় হয়ে তাদের হাতের লাঠি হবে। যোগ্য হয়ে সমাজে তাদের মাথা উঁচু করবে। সন্তান চায় পিতা-মাতা ভালো খাওযাবে পরাবে, লালনপালন করবে, উচ্চ শিক্ষা দেবে। সম্পর্কটা যদি মালিক-শ্রমিকের হয়, শ্রমিক না কাজ করলে ফ্যাক্টরি চলবে না। ফ্যাক্টরি না থাকলে শ্রমিকের পেট চলবে না। সম্পর্কটা যদি পীর মুরিদের হয়, তবে পীরের উদ্দেশ্য হলো মুরিদকে ইসলাহ করার মাধ্যমে কামিয়াবী অর্জন করা। মুরিদের উদ্দেশ্য পীরের নির্দেশনা মেনে জীবনের এপার-ওপার উজ্জ্বল করা। এমনি প্রতিটি সম্পর্ক, প্রতিটি ভালোবাসা। কোন এক অদৃশ্য প্রয়োজনের ডোরে বাঁধা প্রতিটি সম্পর্ক। উভয় পক্ষই কোনো না কোনো দুনিয়াবী বা আখেরের স্বার্থে সম্পর্ক করে। একে অপরকে ভালোবাসে। এতকিছুর পরেও এর স্থায়িত্ব নেই। মাঝপথে কেউ ছেড়ে যায়। কেউ হারিয়ে যায়। কিছু বিলীন হয়ে যায়। অথবা মৃত্য হয় বিচ্ছেদের কারণ। এত সম্পর্কের ভিড়ে একটি সম্পর্ক-ই এমন আছে যেখানে কোন উদ্দেশ্য বা স্বার্থসিদ্ধি নেই। বে-ওয়াফায়ী নেই ছেড়ে যাওয়ার ভয় নেই। তা হলো বান্দার সাথে আল্লাহর সম্পর্ক। বিশ্বময় ওলী-আওলিয়ায় পূর্ণ হয়ে গেলে যেমন তার শান, তার বড়ত্বে কোন কম- বেশি হবে না। ঠিক তেমনি সারা জাহান কাফের-নাস্তিকে ভরে গেলেও তাঁর শানে বিন্দুমাত্র আঁচ পড়বে না। তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন। বান্দার কাছে তার কোনো প্রয়োজন নেই। তিনি সমস্ত প্রয়োজনের উর্ধ্বে। কোনো প্রকার প্রয়োজন ছাড়াই যে সত্তা তাঁর বান্দাকে ভালোবাসেন; এটাই একমাত্র নিঃস্বার্থ ভালোবাসা হাদীসে কুদসিতে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘প্রত্যেকেই তোমাকে তার নিজের জন্য কামনা করে, একমাত্র আমি তোমাকে শুধুই তোমার জন্য ভালোবাসি’। প্রবাদ আছে, ‘যে আল্লাহর জন্য আল্লাহ তার জন্য। কেউ তাকে হেঁটে কাছে পেতে চাইলে তিনি দৌড়ে এসে আগলে নেন।’ বিশুদ্ধ হাদিসের ভাষা, ‘যে আমার দিকে হেঁটে আসে আমার রহমত তার কাছে দৌড়ে দৌড়ে পৌঁছায়।’ তাঁর ভালোবাসার কাছে মাখলুকের ভালোবাসা নস্যি। আল্লাহ বলেন, ‘যে আমাকে ভালোবাসে আমি তার কান হয়ে যাই যে কানে সে শোনে, আমি তার চোখ হয়ে যাই যে চোখে সে দেখে, আমি হাত হয়ে যাই যে হাতে সে ধরে, আমি তার পা হয়ে যাই যে পায়ে সে চলে।’ এ ভালোবাসা যে কতটা নিঃস্বার্থ, গভীর এবং কতটা স্বচ্ছ আসুন একটু অনুধাবন করি।
মানুষে মানুষে প্রেম আর খালেক মাখলুকের প্রেমে পার্থক্য

* মানুষ মানুষকে যতই ভালোবাসুক একদিন বিচ্ছেদ হবেই। স্বামী-স্ত্রী’র মুহাব্বত যতই গভীর হোক না কেনো মৃত্যু একদিন বিচ্ছেদ করেই দেবে, শোক-তাপের অশ্রুই হবে সে প্রেমের শেষ চিহ্ন। কিন্তু আল্লাহর সাথে প্রেমের শেষ পরিণাম হলো মিলিত হওয়া।

* মানুষের যদি একাধিক প্রেমিক / প্রেমিকা থাকে তাহলে সেখানে ফেতনা আবশ্যক। হবেই। কোনো প্রেমিকাই সহ্য করবে না প্রেমিকের দ্বিতীয় কোনো প্রেমিকাকে। খুনোখুনি হয়ে যাবে। কিন্তু দ্বিতীয়জনকে মেনে নেবে না কেউ। কিন্তু আল্লাহপাকের মুহাব্বতের হিসাব ভিন্ন। সম্পূর্ণ ভিন্ন। আল্লাহ রব্বুল ইজ্জতকে যত মানুষ ভালোবাসবে তাদের নিজেদের মধ্যে আপোসে প্রেম হয়ে যায়।

* মানুষ যখন মানুষের সাথে মুহাব্বত করে তখন প্রতিজ্ঞা করায় ‘এ জীবনে আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে ভালোবাসতে পারবা না’। কিন্তু মানুষ যত মনপ্রাণ দিয়ে আল্লাহকে ভালোবাসে স্বয়ং তিনি সেই আশেকের ভালোবাসায় সমস্ত সৃষ্টিকুলকে ডুবিয়ে দেন। আল্লাহও তাকে ভালোবাসেন। সেই সাথে সারা জাহানের মাখলুকাত ও তাকে ভালোবাসতে থাকে। সমস্ত মাখলুক সে বান্দার অনুগত হয়ে যায়। তার একটু পরশ পেতে মুখিয়ে থাকে। তার খেদমত করতে পারাটা বড় সৌভাগ্যের মনে করে।
* মাখলুকের মুহাব্বতে শরীর কাছে থাকলেই তৃপ্ত। মন যেখানে ইচ্ছে থাকুক। আর আল্লাহর মুহাব্বতের মামলা হলো অন্তর আমার কাছে থাকতে হবে শরীর যেখানেই থাকুক।

* মানুষ মানুষকে ভালোবাসে একে অপরের কাছে কিছু পাওয়ার আশায়। শুধু ভালোবাসায় হয় না। ভালোবেসে পাশে থাকলেই দিন কাটে না। পেটের ধান্দায়, দুনিয়াবি ধান্দায় কিছু চাওয়া-পাওয়া, দাবি-দাওয়া থেকেই যায়। পক্ষান্তরে আল্লাহ বান্দাকে ভালোবেসে কিছু দাবি করেন না। কিছু পাওয়ার জন্য ভালোবাসেন না। উল্টো দিয়ে যান। নেয়ামতের দ্বার খুলে দেন। যত ইচ্ছে বান্দা তুমি নাও। এজন্য ভালো যদি বাসতে হয়, প্রেম যদি করতে হয়, তবে আল্লাহর সাথেই করো, কোনো মাখলুকের সাথে নয়। হ্যাঁ, মাখলুককে ভালোবাসবে সেটাও তাঁর নেসবতেই। তাঁকে ভালোবাসার কারণেই। যাকে ভালোবাসলে আল্লাহ খুশি হবেন। আল্লাহর সন্তুষ্টি মিলবে। নিজের মনকে খুশি করার জন্য নয়।

*মানুষ ভালোবেসে তা পূর্ণ করতে পারে না। ভালোবাসার কত কথা, কত ওয়াদা পকেটেই থেকে যায়। সময়-সুযোগের অভাবে পূর্ণ করা হয় না। পূর্ণ করতে পারে না। কিন্তু আল্লাহ তাআলা বান্দার প্রতি তাঁর ভালোবাসা পূর্ণ করেন। প্রথমত যাকে ভালোবাসেন তাকে নিজের হেফাজতে বেষ্টন করে নেন। তার জান-মাল-ইজ্জতের হেফাজতের দায়িত্ব নেন। তার সমস্ত কাজ সহজ করে দেন। তার সমস্ত চাওয়া পূরণ করেন। অভিভাবক হয়ে তার সমস্ত প্রযোজন তার চাওয়ার আগেই পুরা করেন।
এ মর্মে শাইখুল হাদীস হুসাইন আহমাদ মাদানি রহ. থেকে বর্ণিত একটি ঘটনা উল্লেখ করি। এক যুবক তার প্রেমিকার কাছে নিজের মুহাব্বতের প্রকাশ করলো। মেয়েটি বলল, দেখো! তুমি আমাকে যতটুকু ভালোবাসো আমি তারচেয়ে কয়েকগুণ বেশি তোমাকে মুহাব্বত করি। কিন্তু আমার মনে আল্লাহর অসন্তুষ্টির ভয়ও রয়েছে। সেটাও এই ভালোবাসারই কারণ। যা আমাকে কোনরূপ গুনাহে লিপ্ত হতে বাধা দেয়। আমি কোনো গুনাহ করতে পারবো না। বলে মেয়েটি চলে গেলো। ছেলেটির মনে কথাটা দাগ কাটলো। এ কেমন ভালোবাসা! তার অসন্তুষ্টির ভয়ে আমার থেকে বিরত রাখলো! এ প্রেমে কেমন স্বাদ হতে পারে। ঠায় দাঁড়িযে ভাবতে লাগলো ছেলেটি। একপর্যায়ে অনুভব করলো মূলত এটাই প্রেম। আসল ভালোবাসা। অনুপ্রাণিত হলো, তওবা করলো এবং সৎপথে চলে আল্লাহর খাঁটি আশেক হওয়ার শপথ নিলো। অনুশোচনার হৃদয় নিয়ে চলতে শুরু করলো। সে পথে একজন বুজুর্গ ও যাচ্ছিলেন। মঞ্জিল এক হওয়ায় পাশাপাশি হাঁটছেন। প্রচ- গরমের মৌসুম ছিলো তখন। বুজুর্গ লক্ষ করলেন তারা যেদিকে হাঁটছেন একখ- মেঘ মাথার উপর তাদের সাথেই চলছে। বুজুর্গ এটাকে নিজের উপর আল্লাহর রহমত মনে করলেন। যুবকও ভাবলো এই বুজুর্গের ওসিলায় মেঘখ- তাদের ছায়া দিচ্ছে। কিন্তু যেখান থেকে পথ আলাদা হয়ে গেলো সেখানে বুজুর্গ আশ্চর্য হয়ে দেখলেন সে মেঘখ-টি যুবকের মাথার উপর। যুবকের কাছে জানতে চাইলেন, কি এমন আমল যা আল্লাহ তাআলা এত পছন্দ করেছেন ? যুবক কেঁদে ফেলল এবং বলল আমি বড় গুনাহগার। কোনো আমাল নেই আমার। মন থেকে তাওবা করে আল্লাহকে ভালোবাসার ইচ্ছা নিয়ে তাঁর ভরসায় কদম ফেলেছি। কোন হক্কানী আলেমের কাছে দ্বীন শিখার জন্য যাবো বলে। সামান্য এটুকুতেই মাওলা এত একরাম করলেন। তিনি ভালোবাসা পূর্ণ করতে জানেন। আমরা বুঝি না। অবৈধ প্রেমে মজে দীন-দুনিয়া বরবাদ করছি।

আফসোস! অবুঝ মানবমনগুলো বড্ড বেপরোয়া নিজেদেরকে নিয়ে ব্যস্ত। একটু সুখের নেশায় ছুটছি। কেউ অর্থমোহে, কেউ প্রেমমোহে, কেউ সাময়িক হাসছে, কেউ ধুঁকছে, দাঁড়াবার সময়টুকু নেই। সত্যিকারের সুখ-স্বস্তি কোথায় সেটা অনুভব করবে কীভাবে? হৃদয়কুঠুরিতে তালা, মরিচা লেগেছে সেই কবে। মনে নেই। ছুটছে মরীচিকার পিছু। যার শেষে শূন্যতা আর শূন্যতা। দিনশেষে মুঠো খুলে একমুষ্ঠি বালিও মেলে না। রোদের প্রখরে যেটা স্বপ্ন ছিলো, আশ্বাস ছিলো, শেষ ভরসা ছিলো। একবুক শূন্যতা আর হতাশা নিয়ে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরা। দমে থাকা অতৃপ্ত আত্মার রোদন কখনো থামে না। অথচ আল্লাহ তাঁর বান্দাকে ডাকেন। কাছে টানেন। ভালোবাসেন। প্রেমের দ্বার খুলে বসে আছেন। নামাজ- রোজার মাধ্যমে ডাকেন। একে অপরের প্রতি উত্তম মুআমালা মুবাশারাতের মাধ্যমে নিজের কাছে টেনে নেন। একটুকরো মুচকি হাসির বদলা ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, ‘বান্দাসকল! আমার সন্ধানে আত্মনিয়োগ করো। আমাকে পাবে। এটা আমার প্রতিশ্রুতি। যদি আমাকে পেয়ে গেলে তো সবকিছু পেয়ে গেলে। আর যদি আমাকে হারালে, তো সর্বহারা হয়ে গেলে। অনেকভাবে তিনি বান্দাদেরকে ডাকেন। কোরআনে একস্থানে বলেছেন, ‘আল্লাহ কি তাঁর বান্দার জন্য যথেষ্ট নন?’ অবশ্যই! তিনিই যথেষ্ট। তিনি বাদশাহর বাদশা, সর্বোচ্চ ক্ষমতাবান। বান্দার ভাঙা হৃদয় একমাত্র তিনিই জোড়া লাগাতে পারেন। হৃদয়ের ক্ষতগুলো কেউ সারাতে পারবে না তিনি ছাড়া। জীবনের শূন্যতা-হাহাকার উচ্ছ্বাসে পরিণত করতে পারেন। তিনি অতৃপ্তকে তৃপ্ত করেন। অশান্ত ঢেউয়ে তিনিই ভরসা। শুধু প্রয়োজন একটু সম্পর্কের। গভীর প্রেমের সম্পর্ক। এ প্রেমে যে একবার মজেছে তাকে আর কোনো প্রেমই মোহাবিষ্ট করতে পারেনি। যে অন্তরে আল্লাহর প্রেম রয়েছে তার মূল্য আল্লাহর নিকট আরশেআযীমের চেয়েও বেশি। দুনিয়ার কোনো ঐশ্বর্য, ধন-সম্পদ, ভোগ-বিলাসিতা সে অন্তরে স্থান নিতে পারে না। কারণ, যে হৃদয় খোদাপ্রেমে জ্বলে গেছে, সেখানে ক্ষণস্থায়ী মিথ্যা বসন্তের কোনো জায়গা নেই। এই হৃদয়ে যদি বসন্ত জাগে তো আল্লাহর প্রেমেই জাগবে, তাঁরই প্রেমের ফুল ফুটবে। যার সৌরভ ছড়াবে আশে পাশে, দূর-দিগন্তে। যে হৃদয়ে আল্লাহর মুহাব্বত নেই তা যেনো এক বিরান মরুভূমি। আঁধারকালো পরিত্যক্ত পোড়াবাড়ি। যেখানে না কোন আলো আছে, না কেউ প্রদীপ জ্বালবে। সেখানে না বসন্ত আসে, না পাখিরা গায়, না ফুল সুবাস ছড়ায়, না প্রজাপতিরা ডানা ঝাপটায়। তবে এমন মৃত্যু-মরুতেও আসতে পারে প্রাণ। পাখি-ভোমরায় গুঞ্জরিত পুষ্পদ্যান হতে পারে। যদি তাতে স্রষ্টা প্রেমের মশাল জ্বলে। আসুন হাজার বছরের পাপ-পঙ্কিলতাগুলো অনুশোচনার অশ্রুতে ধুয়ে স্রষ্টার প্রেমে নিবেদিত হই।
-লেখিকা নাঈমা তামান্না*

Collected from Opekkha (Divine Philosophy)

0 Comments: