সূফিবাদ কি? সুফিবাদের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ নিয়ে আলোচনা কর। সূফিবাদের
প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা কর। ভূমিকাঃ

সূফিবাদ কি? সুফিবাদের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ নিয়ে আলোচনা কর। সূফিবাদের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা কর। ভূমিকাঃ


আল্লাহের নিকট একমাত্র গ্রহণযোগ্য দীন হল ইসলাম।আল্লাহ তা’য়ালা মানব জীবনের সকল কর্মকাণ্ডসমূহসঠিকভাবে পরিচালনা করার জন্য হযরত মুহাম্মদ(সাঃ)এর মাধ্যমে এ জীবন বিধান পেশ করেছেন।ইসলাম ধর্মমানুষেরব্যক্তিগত,পারিবারিক,সামাজিক,রাষ্ট্রীয়,ইহলৌকিক ওপারলৌকিক প্রভৃতি বিষয় ধর্মীয় দিক-নির্দেশনা দিয়েথাকে।মানব জীবনের প্রতিটি প্রতিদিকে দুটি স্তর রয়েছেযার একটি হল বাহ্যিক(বস্তুগত) দিক আরেকটি হলআভ্যন্তরীন (আধ্যাত্মিক) দিক।ইসলাম মানুষের দুটিদিক নিয়ে গভীরভাবে পর্যালোচনা করে।মানুষকেআশরাফুল মাখলুকাত এ শুধু তার দেহের জন্য করেনাই বরং তার একটি বাতিনী দিক আছে যা হল আত্মা।আত্মার শান্তির জন্য মানবতা যুগে যুগেজড়বাদ,বস্তুবাদের আবর্তে ঘুরছে।কিন্তু প্রকৃত শান্তিতারা খুজে পায় নাই।তাই কবি শেখ সাদী (র.) বলেন, “এই সমুদ্রে হাজার কিশতী ডুবে গেছে;কিন্তুএকটিও ভেসে উঠে নদীর তীরে পৌছে নাই”।জড়বাদ মানুষের যে অধিকার ছিনিয়ে নিয়েছে তাবুদ্বিবাদ তা পূর্ণ করতে পারে নাই আর তার শূন্যতা পূরণকরেছে ইসলামের আধ্যাত্মিকতা।আর ইসলামের এইআধ্যাত্মিক জ্ঞানের নাম হল সূফীবাদ।মানুষের জীবনআত্মা এবং দেহের সমন্বয় গঠিত।যে জ্ঞানের সাহায্যেআত্মাকে পরিশুদ্ব করা যায় তাই হল তাসাউফ।সূফি শব্দের উৎপত্তিসূফি শব্দটি কোন শব্দ হতে এসেছে সে ব্যাপারে মুসলিমপণ্ডিতদের ভিতর বেশ কয়েকটি মতামত পাওয়া যায়।সেগুলো নিয়ে নীচে আলোচনা করা হলঃপ্রথম মতামতঃ  ইবনে খালিদুন,ড. এ.ই আফিফী,আল-কালবাদী,আর-রুদবারী,আবূ নসর আস-সাররাজ প্রমুখপণ্ডিতগণের মতে,সূফী শব্দটি সূফূন হতে নির্গত যাতঅর্থ হল পশম।পশমী বস্ত্র সরলতা ও আড়ম্বহীনতারপ্রতীক।হযরত মুহাম্মদ(সাঃ) ও তার সাহাবাগণ বিলাসীজীবন-যাপনের পরিবর্তে সাদা-সিদে পোশাক পরতেনএবং পরবর্তীতে সূফীগণ সাদাসিধা জীবন-যাপনেরজন্য এই পোশাল গ্রহণ করে কম্বল-সম্বল করে চলেনবলে তাদেরকে সূফী বলা হয়।দ্বিতীয় মতামত,  কারো মতে সূফী কথাটি সফফুন হতেনির্গত যার অর্থ হল কাতার,শ্রেণী,লাইন ইত্যাদি।যেহেতুসে মর্যাদার দিক দিয়ে প্রথম শ্রেণীর লোক।এজন্যতাদের সূফী বলা হয়।তৃতীয় মতামত, আলী হাজাবিরী,মোল্লা জামী (র।) এরমতে, সূফী কথাটি সাফা হতে নির্গত যার অর্থ হলপবিত্রতা,আত্মশুদ্বি ও স্বচ্ছলতা।যারা আত্মারপবিত্রকরণ সাধনায় নিয়োজিত থাকেন তাদেরকে সূফীবলা হয়।চতুর্থ মতামত, কিছু পাশ্চত্যের পণ্ডিত বলেছেন যেসূফী কথাটি সোফিয়া বা সোফিস্ট কথা হতে নির্গতহয়েছে যার অর্থ হল জ্ঞান।কিছু মানুষ আধ্যাত্মিকজ্ঞানের অধিকারী বলে তাদেরকে সূফী বলা হয় আর এশাস্ত্রকে তাসাউফ বলা হয়।তবে শেষোক্ত মতামত একেবারে অগ্রহণযোগ্য।কারণবিদেশি কোন শব্দ হতে ইসলামের কোন একটি বিষয়নির্গত হবে তা হতে পারে না।অন্যদিকে প্রথম তিনটি মতামতের ভিত্তিতে যে সূফীশব্দটি এসেছে তাও অনেকে মানতে নারাজ। এ ব্যাপারেমুহাম্মদ আব্দুল মালেক ও মুহাম্মদ আব্দুল লতিফস্যারের “ইসলামে সূফী দর্শন” নামক প্রবন্ধে বলাহয়েছে যে,সূফী কথাটি যে সুফূন(পশম) হতে নির্গত তা গ্রহণযোগ্যনয়।কারণ এর দ্বারা সূফীদের কেবল পোশাক-পরিচ্ছেদও অবয়বের কথা বলা হয়েছে।যেহেতু সূফিবাদ মানুষেরবাতিনী দিকের পরিচায়ক তাই এই বাহ্যিক দিকেরনির্দেশক পশম হতে সূফীর উৎপত্তি হয়েছে তাযুক্তিসঙ্গত নয়।আবার সাফা(পবিত্রতা) হতে যে সূফীকথাটি এসেছে তাও গ্রহণযোগ্য নয়।কারণ এটা হলসূফীদের জীবন-সাধনার একটি নির্দেশক মাত্র।আবারসফফুন হতে সূফী এসেছে এ কথাও বিশ্বাস করা যায় নাকারণ তা একটি কাল্পনিক ধারনামাত্র।একমাত্র আহলে সূফফা(বারান্দার অধিবাসী) শব্দেসূফী তত্ত্বের ও সূফী জীবনের বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীনদিক পরিস্ফূট হয়ে উঠে।তারাই পশমী পোশাক সর্বদাপরিধান করতেন এবং সর্বদা আল্লাহের যিকিরে মশগুলথাকতেন।তারা আল্লাহের সম্মানে চাদরাবৃত।তারাই নবীকরিম (সাঃ) এর সাহচর্যে থেকে সর্বদা আভ্যন্তরীন ওবাহ্যিক জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। কাজেই আহলেসুফফা হতে যে সূফী কথাটির উদ্ভব ঘটেছে তাঅকাট্যভাবে প্রমাণিত।(সূত্রঃ ইসলাম ওআধ্যাত্মিকতাঃ১০৩)
সূফিবাদের পারিভাষিক সংজ্ঞাসূফীবাদের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে মুসলিম দার্শনিকবৃন্দ ওআধ্যাত্মিক সাধনায় সাধনাকারী ব্যক্তিবর্গ বিভিন্নভাবেসংজ্ঞা প্রদান করেছেন।তার ভিতর প্রধান প্রধানকয়েকটি সংজ্ঞা হল নিম্নরুপঃইমাম শামী (র.) বলেন, “সূফীবাদ হল আধ্যত্মিকজ্ঞান যে জ্ঞানের সাহায্যে মানুষের সৎ গুণাবলীরপ্রকারভেদ এবং তা অর্জনের পন্থা ও অসৎগুণাবলীর প্রকারভেদ ও তা থেকে রক্ষার উপায়জানা যায়।”জুনায়েদ বাগদাদী(রঃ) বলেছেন, “আত্মিক পবিত্রতাঅর্জন ও আল্লাহ ছাড়া সবকিছু হতে প্রভাবমুক্তহওয়ার নাম হল ”যুন্নন মিসরীর মতে, “আল্লাহ ছাড়া আর যা কিছুআছে সবকিছু বর্জন করার নাম হল সূফীবাদ।”ইমাম গাযযালী(র.)বলেন, “তাসাউফ এমন একটিবিদ্যা যা মানুষকে পশু হতে উন্নীত করে,মনুষ্যত্বেরচূড়ান্ত প্ররযায়ে পৌছিয়ে দেয়।”তিনি আরো বলেন, “সূফীবাদ হল মু’মিনদের অন্তরের জ্যোতি যা নবীকরীম (সাঃ) এর প্রদীপ হতে গ্রহণ করা হয়েছে।”বায়জীদ বোস্তামী (র.) বলেন, “আল্লাহের ইবাদতে মগ্নথাকা ও আল্লাহকে পাওয়ার উদ্দেশ্যে পার্থিব দুঃখ-কষ্ট বরণ করার নাম হল সূফীবাদ।”শায়খুল ইসলাম যাকারিয়া (র.) বলেন, “তাসাউফমানুষের আত্মার বিশোধনের শিক্ষা দান করে।তারনৈতিক জীবনেকে উন্নীত করে এবং স্থায়ী নিয়ামতেরআধিকারী করার উদ্দেশ্যে মানুষের ভেতরের ওবাইরের জীবনকে গড়ে তুলে। এর বিষয়বস্তু হলআত্মার পবিত্রতা ও লক্ষ্য হল চিরন্তন সুখ শান্তিঅর্জন।”আবূ মুহাম্মদ আয-যারিনি বলেছেন, “Sufism is the building up of good habits and freeing of heart from all evil desires.”তাহলে বলা যায় যে, নবী করিম (সাঃ) এর নির্দেশিতপথে আত্মশুদ্বি করে ইসলামের বাহ্য ও অন্তর জীবনেরপ্রেমপূর্ণ বাস্তব অনুশীলনের মাধ্যমে পরম সত্তার পূর্ণজ্ঞানার্জন ও তার নৈকট্য লাভজনিত রহস্যময়উপলব্ধিকে সূফীবাদ বলা হয়।
সূফিবাদের উৎপত্তিসূফিবাদের উৎপত্তি কিভাবে হয়েছে তা নিয়ে পণ্ডিতদেরভিতর মতবিরোধ লক্ষ্য করা যায়।সূফীবাদ কথাটিমুসলমানদের ভিতর থেকে কিভাবে এসেছে সেসবমতামতসমূহ নিম্নঃরুপঃ১. বেদান্ত ও বৌদ্ব দর্শনের প্রভাব২. খ্রিষ্টনিয় ও নিও-প্লেটানিক প্রভাব৩.পারসিক প্রভাব৪.কুরআন হাদীসের প্রভাব
উপরের তিনটি মতবাদকে আভ্যন্তরীন মতবাদ বলা হয়আর শেষেরটিকে বাহ্যিক উৎস বলা হয়।এসকলমতবাদ নিয়ে নীচে আলোচনা করা হলঃ১. বেদান্ত ও বৌদ্ব দর্শনের প্রভাবঃ পশ্চাত্যের কিছুচিন্তাবিদ তথা গোল্ডযিহার,এইচ মার্টেন এরমতে,সূফিবাদ বেদান্ত দর্ষন ও বৌদ্ব দর্শন হতে উদ্ভূত।কারণ,মুসলমানেরা যখন ভারতীয় উপমহাদেশেআগমন করে এরপর থেকে ভারতীয় সন্ন্যাসী ও বেদান্তবৌদ্বদের প্রভাবে প্রভান্বিত হয়ে মুসলমানগণ কঠোরসংযম ও কৃচ্ছতা সাধনের স্পৃহা জাগিয়ে তুলে।আর সেথেকে মুসলমানদের ভিতর সূফিবাদের উদ্ভব ঘটে।পারতপক্ষে এ ধরনের মতামত ঐতিহাসিক দৃষ্টিভংগীঅনুযায়ী সঠিক নয়।কারণ ভারতীয় উপমহাদেশেমুসলমানেরা আসার অনেক আগে থেকে সুফিবাদকথাটির উদ্ভব ঘটেছিল।হাসান বসরী,যুন্নুনমিসরী,আবুল হাশিম কূফী,ইব্রাহীম বিন আদহাম রাবিয়াবিসরী প্রমুখ সূফিদের আবির্ভাব ও সাধনা প্রমাণ করেযে,সূফিবাদ ভারতীয় আমদানি নয়,ইসলামেরআধ্যাত্মিক শিক্ষার ফলে সূফিবাদের উদ্ভব ঘটে।তাছাড়া বৌদ্ব সন্যাসীগণ জাগতিক কার্যক্রমলেসম্পূর্ণরুপে অস্বীকার করে আর তার ধ্যান-সাধনারজন্য নির্জন জায়গা বেছে নিয়েছে।অন্যদিকে মুসলিমসূফী-সাধকগণ আল্লাহ পাকের ধ্যান করার সাথে সাথেসংসারও করে থাকেন। আবার বৌদ্ব ধর্মে নির্বাণ সত্তায়আত্মবিলোপ শেষ আর মুসলিম সূফিগণ ফানাকে শেষস্তর বলে মনে করে না বরং তারা বাকাবিল্লাহকে সূফী-পথ পরিক্রমার সর্বশেষ স্তর মনে করে থাকে।সুতরাং,বৌদ্ব ও বেদান্ত হতে সূফিবাদের উৎপত্তি হয়েছেএ ধরনের মতবাদ সম্পূর্ণরুপে ভিত্তিহীন।২.খ্রিষ্টিয় ও নিওপ্লেটিক মতবাদঃ অধ্যাপক নিকলশনও ভনক্রেমার এ মতামত ব্যক্ত করেছেন যে,মুসলমানদের ভিতর সূফিবাদের আবির্ভাব ঘটেছেখ্রিষ্টিয় ও নিওপ্লেটিক মতবাদ হতে।তারা এ কথা অত্যন্তজোড় দিয়ে বলেছেন যে, যখন মুসলিমরামিসর,সিরিয়া,প্যালাষ্টাইন প্রভৃতি দেশ জয় করতে থাকেসে অবস্থায় খ্রিষ্টীয় চিন্তা-দর্শন মুসলিম চিন্তা-দর্শনেরভিতর আবির্ভূত হয়  এবং এরই প্রভাবে তপস্যা ওসংযমবাদের অনুপ্রবেশ সূফীদের ভিতর ঢুকে আর সেইথেকে সূফিবাদের আবির্ভাব ঘটেছিল। নিকেলসন একথা অত্যন্ত জোড় দিয়ে বলেছেন যে,সে সময় মুসলিমসম্রাজ্যের অনেক জায়গায় জাষ্টিয়ানদের আধিপাত্যছিল আর সে থেকে সূফিবাদের উৎপত্তি হয়েছে।পারতপক্ষে এ ধরনের মতাবাদ সঠিক নয়।কারণমুসলিম সূফি-সাধকগণ খ্রিষ্ট্রীয় সন্যাসীদের ন্যায় সংসারবিরাগী নয়।আর তাছাড়া মহানবী (সাঃ),সাহাবা ওতাবিঈদের সময় হতে এ ধরনের আধ্যাত্মিক সাধনায়মুসলমানেরা নিয়োজিত ছিল।তাই খ্রিষ্ট্রীয় ওনিউপ্লেটনিক মতবাদ হতে যে সূফিবাদের উদ্ভব ঘটেছেএ ধরনের কথা সম্পূর্ণরুপে অযৌক্তিক।৩. পারসিক প্রভাবঃ ঐতিহাসিক ব্রাউনি আর তার কিছুঅনুসারীরা বলেছেন যে,সূফিবাদের উৎপত্তি ঘটেছেপারসিক প্রভাব হতে।তারা এ যুক্তি সকলের সামনেতুলে ধরেছে যে, পারসিক জাতি ছিল এক অহংকারী ওদম্ভ জাতি।কিন্তু তাদের উপর যখন আরবেরা জয় করলতখন হতে তাদের ভিতরে এক ধরনের হতাশা কাজকরতে শুরু করল।সেখান থেকে তারা আধ্যাত্মিকসাধনায় নিয়োজিত থাকের ব্যাপারে এক ভিন্ন চিন্তা-ধারা আবিষ্কার করে আর সেখান থেকে সূফিবাদেরআবির্ভাব ঘটে আর তারই ধারাবাহিকতায় পারস্যেঅনেক দার্শনিক আবির্ভূত হয়।পারস্যের ভিতর যেম্যানিকীয় ও ম্যাজদেকীয় ধর্মের অস্তিত্ব ভিতরসূফিবাদের কৃচ্ছতাপূর্ণ জীবন-যাপনের উপকরণ খুজেপাওয়া যায়। পারতপক্ষে এ ধরনের কথাও সম্পূর্ণঅযৌক্তিক ও ভিত্তিহীন।কারন বেশিরভাগ সূফীপারস্যের হলেও তার মানে এ বুঝায় না যে, সূফিবাদপারস্য হতে এসেছে।কারন আবূ বকর ইবনুল আরাবী ওইবনুল ফরিদসহ অনেক দার্শনিক আরবীভাষী ছিলেন।আর আমাদের প্রিয়নবী (সাঃ),সাহাবীগণ ওতাবিঈগণের সময় হতে এক ধরনের তাপস্যা শুরু হয়এবং তারা বিদেশী ধ্যান-ধারনা থেকে সম্পূর্ণমুক্তছিলেন।।৪.কুরআন ও হাদীসের প্রভাবঃ সূফিবাদ যে কোনবাইরের চিন্তা-দর্শনের দ্বারা প্রভাবিত হয় নাই তা পূর্বেউল্লেখ করা হয়েছে।ইসলামী আধ্যাত্মিক শিক্ষার মূলউৎস হল আল-কুরআন।যদিও কুরআন ও হাদীসেসূফিবাদ শব্দটি সরাসরি ব্যবহার করা হয় নাই তবুওকুরআনের অসংখ্য আয়াত ও রাসূল(সাঃ) এর অসংখ্যহাদীসের দ্বারা সূফিবাদ তথা আধ্যাত্মিক জ্ঞানের দিকেবিশেষভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে।ইবনে খালিদুনঅত্যন্ত জোড় গলায় বলেছেন যে, সূফিবাদ এমন একধর্মীয় বিজ্ঞান যার উৎপত্তি খোদ ইসলাম হতেহয়েছে”। কুরআনের অসংখ্য আয়াত রয়েছে যার দ্বারামরমীধারাকে ইসলাম বিশেষভাবে উৎসাহিত করেছে।সেখান হতে কিছু আয়াত নীচে উল্লেখ করা হলঃ“তাঁর সিংহাসন সমস্ত আসমান ও যমীনকেপরিবেষ্টিত করে আছে।”[বাকারাঃ২৫৫]“তিনি তোমাদের সাথে আছেন তোমরা যেখানেইথাক”[হাদীদঃ৪]“তিনিই প্রথম, তিনিই সর্বশেষ, তিনিই প্রকাশমান ওঅপ্রকাশমান এবং তিনি সব বিষয়ে সম্যকপরিজ্ঞাত।” [হাদীদঃ৩]“আমি মানুষ সৃষ্টি করেছি এবং তার মন নিভৃতে যেকুচিন্তা করে, সে সম্বন্ধেও আমি অবগত আছি।আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনী থেকেও অধিকনিকটবর্তী।” [ক্বাফঃ১৬]“সুতরাং তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমিওতোমাদের স্মরণ রাখবো”। [বাকারাঃ১৫২]“যারা আমার পথে সাধনায় আত্মনিয়োগ করে,আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথে পরিচালিতকরব।” [আ্নকাবূতঃ৬৯]“তারা খাঁটি মনে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ্র ইবাদতকরবে,” [বাইয়েনাহঃ৫]হাদীসের দ্বারা তাসাইফের কথা অকাট্যভাবে প্রমাণিতহয়।একবার রাসূলে করীম (সাঃ)কে জিজ্ঞাসা করাহয়েছিল যে ইহসান কি?তিনি উত্তরে বলেছিলেন,“ইহসান হল এ বিষয় যে,তুমি যখন নামায পড়বেতখন তুমি এ মনে করবে যে আল্লাহকে তুমি দেখছআর তাও যদি সম্ভব না হয় তাহলে এই মনে করবেযে আল্লাহ তোমাকে দেখছেন”।হাদীসে কুদসীতে বলা হয়েছে যে, যে ব্যক্তি নিজেকেচিনল,সে আল্লাহকে চিনল”।হাদীসে কুদসীতে আরও এসেছে যে, আল্লাহ বলেন,“যখন আমি আমার কোন বান্দাকে ভালবাসি তখনআমি তার ধ্যান-অনুধ্যানে ও কাজে কর্মে নিকটবর্তীহই। আমি তার চোখ হই যা দিয়ে সে দেখে,আমিতার কান হই যা দিয়ে সে শুনতে পায়,আমি তার হাতহই যার সাহায্যে বিভিন্ন জিনিস ধরে।”অর্থাৎ,কুরআনে অসঅংখ্য আয়াত ও হাদীসের দ্বারা একথা অকাট্যভাবে প্রমাণিত যে সূফিবাদ কুরআন-হাদীসহতে নিঃস্বরিত এক ধরনের বাতিনী জ্ঞান।এ ছাড়াওআমরা এ বিষয়টি লক্ষ্য করে দেখতে পাই যে, নবীকরিম (সাঃ) হেরা গুহায় গভীর ধ্যানে নিমজ্জিতথাকতেন যার দ্বারা বুঝা যায় যে তিনি আধ্যাত্মিকজীবন সাধনায় প্রায় সময় ব্যস্ত থাকতেন। নবী করীম(সাঃ) এর জীবদ্দশায় আহলে সুফফার কিছু লোকআল্লাহ পাকের ধ্যান সাধনায় এমন সময় ব্যয় করেছেনযার দ্বারা ধারনা করা হয় যে সূফিবাদ কথাটির উৎপত্তিঘটেছে। অতঃপর খুলাফায়ে রাশেদীনের সময় হযরতআবূ বকর(রাঃ),উমার(রাঃ),উসমান(রাঃ) ও আলী(রাঃ)প্রত্যেকে তারা শাসনকার্য পরিচালনার পাশাপাশিঅসংখ্য ইবাদত-বন্দেগীর মাধ্যমে আধ্যাত্মিক সাধনায়ব্যস্ত থাকতেন। সৈয়দ আমীর আলী বলেন, “আলী(রাঃ) এর মৃত্যুর সাথে খিলাফত ধংসব হতেথাকে আর দামেস্কে যে বর্বরোচিত অত্যাচার শুরুহতে থাকে সেখান থেকে কিছু মানুষ একান্তে ইবাদতবন্দেগী করতে বাধ্য আর সেখান থেকে অতীন্দ্রয়বাদস্বাভাবিকভাবে অগ্রসর হতে থাকে”।কুরআন ও হাদীসে সূফিবাদকে বিভিন্ন নামে নামকরণকরা হয়েছে।তা হল ইলমে বাতিনী,ইলমে লাদুন্নী,ইলমেইলমে তরীকত,ইলমে মারিফত ইত্যাদি নামে অভিহিতকরা হয়েছে। সে সময় হতে হাসান বসরীসহ প্রমুখ তাবিয়ীর মাধ্যমেমরমীবাদ প্রকাশ হতে থাকে।উমাইয়্যা খিলাফত আমলেমানুষের বাহ্যিক চিন্তা-চেতনার এতটা বিকাশ ঘটে নাইযতটা বিকাশ ঘটেছিল আব্বাসীয়দের আমলে।সে সময়সূফিবাদের একটি চূড়ান্তরুপ লাভ করে।সেঅর্থাত,হিজরীর ২য় শতকে এসে সূফিবাদ নামে একটিস্বতন্ত্র ইসলামী মরমীধারার উদ্ভব ঘটে।সে সময় যেসমস্তকারনে সূফিবাদের উদ্ভব ঘটে তার প্রধান প্রধানকারনসমূহ নিম্নরুপঃ(১)খলিফা হারুন-উর-রশিদের ইন্তেকালের পর তার দুইপুত্র আমীন ও মামুনের ভিতর যখন মতবিরোধ দেখাদেয় তখন এক বীভীষীকাময় রাজনোইতিক অবস্থাবিরাজমান ছিল।অন্যদিকে ইসমাইলীয়া,বাতিনিয়া ওকারামাতিয়া প্রভৃতি সম্প্রদায়ের অনুসারীগণ ধর্মেরনামে অভীষ্ট রাজনীতির প্রচারণা চালাতে থাকে।এমতাবস্থায় কিছু লোকজন রাজনীতি থেকে কিছু মানুষইবাদতে ধ্যান-মগ্নে থাকার প্র্যাস পান এববগ এর ভিতরশান্তি তারা খুজে পেয়েছিল।(২)আব্বাসীয়দের খিলাফতামালে মুতাযিলা সম্প্রদায়েরচিন্তা-চেতনার আবির্ভাব ঘটেছিল সেখানে মানুষেরভিতর এক ধরনের সংশায়াত্মক অবস্থার সৃষ্টি করেছিলআর মুতাযিলাদের সাথে অন্যান্য গোষ্ঠির ভিতর যেদ্বন্দ্বের আবির্ভাব হয়েছিল তা থেকে পরিত্রানের জন্যকিছু লোক আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যমে ইবাদত-বন্দেগীর মাধ্যমে শান্তি খুজে পাওয়ার প্রয়াস খুজেপেয়েছিল।(৩)হানাফী,শাফিয়ী,মালিকি ও হাম্বলী মাযহাব যেআবেগ বর্জিত পরহেজগারিতা নিয়ে এসেছিল সেঅবস্থায় সম্পূর্ণ আবেগধর্মী অবস্থার দিকে এক দলমানুষ ধাবিত হচ্ছিল।তাহলে আমরা বলতে পারি যে,তাসাইফের উৎপত্তিপ্রকৃতপক্ষে বাহিরের কোন চিন্তা-ধারনা থেকে নয় বরংকুরআন-হাদীস ও মুসলমানদের নিজস্ব চিন্তা-ধারাকেকেন্দ্র করে হয়েছে।মহানবী(সাঃ) এর জীবদ্দশায় এরউৎপত্তি ঘটেছিল যাসূফিবাদের ক্রমবিকাশঃপ্রকৃতপক্ষে সূফিবাদের আবির্ভাব মুহাম্মদ(সাঃ) এরসময় হতে শুরু হয়।অতঃপর যাকে সর্বপ্রথম মুসলিমসূফী হিসেবে চিহ্নতি করা হয় সে হল হযরত হাসানবিসরি(র.) তার জ্ঞানতত্ত্বের আলোকে সূফী-সাধকগণসূফিবাদের ক্রমবিকাশে এক বিশেষ ভূমিকা পালনকরে।তার ভিতর মরমী ও দার্শনিক চিন্তা-ধারার একঅপূর্ব মিলন ঘটেছিল।এছাড়াও সর্বপ্রথম সূফী হিসেবেযার নাম স্বীকৃতি দেওয়া হয় সে হল আবয় হাশিম কূফী।কেউ কেউ আবার জাবির বিন হাইয়্যানকে প্রথম সূফীহিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন।এরপর হিজরীর ২য়শতকে এসে সূফিবাদের জনপ্রিয়তা ব্যাপক হারে বৃদ্বিপেতে থাকে।এ সময়ের উল্লেখযোগ্য সূফীগণ হলেনইব্রাহীম বিন আদহাম,রাবিয়া বসরী,দাউদ আত-তায়ী ওফুযায়ল বিন হাইয়ায প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ।তাদের কার্যকলাপও বাণী থেকে আস্তে আস্তে কৃচ্ছতা জীবনে উদ্ভব ঘটতেথাকে।এরপরে সূফিবাদের ক্রমবিকাশে যুন্নুন মিসরীর ভূমিকাছিল ব্যাপক।তিনি ইসলামী মরমীবাদকে স্তভ হিসেবেস্থাপিত করেছিল।তাই তাকে সূফিবাদের সর্বপ্রথমব্যাখ্যাদানকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।তিনি হাল ওমাকাম সম্পর্কে সূফী-সংক্রান্ত সূত্র প্রদান করেন।অতঃপর যুনায়েদ বাগদাদী যুন্নুন মিসরীর ধারনাকেআরো উন্নতি ও সুসংবদ্ব করেন।কালক্রমে সূফিবাদের ভিতর সর্বেশ্ববাদের ধ্যান-ধারনাযুক্ত হতে থাকে।এ ধরনের মতাবাদের মূল প্রবক্তাছিলেন বায়জীদ বোস্তামী ও মানসুর হাল্লাজ।তবেমানসুর হাল্লাজের বক্তব্য কিছুটা বিতর্কিত ছিল যে জন্যতাকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল।অতঃপ্অর ইমামা আল গাযযালী এর সময় থেকেগোড়া সুন্নিবাদী মতবাদ সূফিবাদের ভিতরে একটিবিশেষ স্থান দখল করে নেয়।তিনি গোড়া ইসলাম ওসূফিবাদের ভিতর একটি সুন্দর মিল তৈরী করেন।।তারসময় অনেল সূফীর আগমন হয় যার মধ্যে আব্দুলকাদির জিলানী,ফরিদ উদ্দিন আত্তার,আল-কুশাউরী,শিহাবুদ্দিন সোহয়ার্দীর নাম বিশেষভাবেউল্লেখযোগ্য।সপ্তম হিজরীতে স্পেনে ইবনুল আরাবী সূফিবাদেরক্রমবিকাশে এক বিশেষ ভূমিকা পালন করে।তিনিসর্বেশ্বরবাদের প্রচলন করেন।তার তার প্রতিষ্ঠিতমতবাদের নাম ছিল “ওয়াহাদুল অজুদ”।তার এই মরমীধারার ক্রমবিকাশে সাহায্য করেছিলেন জালালুদ্দিনরুমি (র.)।তার মসনবী শরীফ পৃথিবীর ইতিহাস একঅমূল্য গ্রন্থ হিসেবে বিশেষ স্বীকৃতি লাভ করেছে।ইবনুলআরাবীর এই মতবাদের সামনে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েরুকুনুদ্দিন আলাউদ্দৌলা একটি পৃথক মতবাদ গঠনকরেন যা শুহুদিয়া নামে পরিচিত।তার এই সম্প্রদায়কেবাহাউদ্দীন বিশেষভাবে সমর্থন দিয়েছেন এবং হিজরীএকাদশ শতাব্দীতে এ মতবাদটি ইতিহাসে এক বিশেষস্থান দখল করে রাখে।    পরবর্তীতে সূফী-সাধকদেরভিতর কাশানী,আলজিলি এর নাম বিশেষভাবেউল্লেখযোগ্য।অতঃপর ভারতীয় উপমহাদেশে অনেকসূফীর আবির্ভাব ঘটে যাদের ভিতর খাজা মইনুদ্দিনচিশতী,বাহাউদ্দিন,শিহাবুদ্দিন,মুজ্জাদিদ আলফে সানীরনাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।বিশেষ করে আলফেসানী সূফিবাদকে ভারতীয় উপমহাদেশে নতুন করেউজ্জীবিত করেন।তিনি প্রকৃতপক্ষে এ শুহুদিয়াসম্প্রদায়কে বিকাশে এক বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।অতঃপর ১৮৩৭ সালে মুহাম্মদ বিন আলী ১৮৩৭ সালেআলজেরিয়াতে একটি পৃথক সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠা করেন।এভাবে সূফিবাদের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সময় ক্রমবিকাশ হতে থাকে।


0 Comments: