আল্লাহর ধ্যান সাধনার প্রকৃয়া কেমন এবং কি ভাবে?
————————————————————
তোমার আল্লাহ আছে কি? যদি থেকে থাকে তবে কি ভাবে আল্লাহর ধ্যান সাধনা কর? আর কোন আল্লাহরই বা বন্দেগী করছ, তা কি নিজে জানো? অথচ “ শাইখ তাঁর মুরীদের জন্য জুতাসহ মাবুদ হয়ে আছেন!!! ”।

“ধ্যানের দ্বারা প্রেমাগুণ প্রজ্জ্বলিত হয়। যে ধ্যান করে না সে প্রেম থেকে বঞ্চিত।” আল্লাহ বলেন,( যারা আমাতে সাধনা করে আমরা তাদের আমাদের পথগুলো প্রদর্শন করি)[ সূরা আনকাবুত—৬৯]
এবার আসা যাক মূল আলোচনায়, আলোচনা অতি দির্ঘ্য! অবশ্যই আত্মার জ্ঞান অন্যেষণকারীগন ধৈর্য নিয়ে পড়বেন এবং তা থেকে আলোর সন্ধান পাবেন। এটা আমি দৃঢ় বিশ্বাসী। কারণ সবকিছু সত্যের ফলশ্রুতিতে প্রকাশিত।
মুর্শিদকে দেখলে মৃত অন্তর সজীব হয় বা রোগাক্রান্ত অন্তর আরাম বোধ করে এবং চিন্তিত হৃদয়ের চিন্তা দূর হয়। মুর্শিদের আসল এবং প্রকৃত রূপ যে দেখে, সে মরে না!যেমন আযরাঈলের( আঃ) আসল রূপ যে দেখে, সে বাঁচেনা। তবে এ দেখা কয়েক প্রকার হতে পারে, যেমন- বাহ্যিক চক্ষু দ্বারা দেখা এবং অন্তর দৃষ্টিতে বা ধ্যানে দেখা।
বাহ্যিক চক্ষু দ্বারা দেখার জন্য সামনা-সামনি হওয়া প্রয়োজন। ধ্যানে দেখার ব্যাপরে কাছে বা দূরে, অতি দূরেও কোন পার্থক্য নেই। কারণ এটা মুর্শিদের বৈশিষ্ট্য। তবে যার ধ্যানশক্তি উম্মোচিত হয়েছে, তাঁর জন্য মুর্শিদ রূপের ধ্যান একটা বিরাট নিয়ামত। এর ন্যূনতম উপকারিতা হলো এই যে, এ ধ্যানে আপন মুর্শিদের সাহচর্যের উপকারিতা পাওয়া যায়। অর্থাৎ মুর্শিদের অবর্তমানে মুর্শিদের রূপের ধ্যান মুরিদকে তাঁর সাহচর্যের উপকারিতা প্রদান করতে পারে।
উল্লেখ্য যে, মুর্শিদের আসলরূপ আল্লাহর সত্তার সাথে সম্পর্কিত। নবী করীম( সঃ) বলেন-যে আমাকে দেখেছে, বস্তুতঃ সে আল্লাহকে দেখেছে।সুতরাং যে আল্লাহকে দেখেছে, সে আলমে লাহুত বা ঐশী জগতের অধিকারী হয়েছে। আর আলম-এ লাহুতে মৃত্যুর প্রবেশাধিকার নেই। অতএব, যে নশ্বর জগৎ অতিক্রম করে অমর জগতে প্রবেশ করেছে, তার আর মরণ নেই; বরং সে অনন্ত জীবনের অধিকারী হয়ে যায়। এ জন্য আল্লাহর অলিগণ ছাড়া অন্যরা এ বিষয় বুঝে না। না বুঝে ভাল কথা, কিন্তু বিপদ এই যে, তারা মুর্শিদ সাধনার ঘোর বিরোধী।
এখানে স্মরণীয় যে, মুর্শিদের রূপ আল্লাহর গুণাবলীতে পরিপূর্ণ। যার ধ্যানের মাধ্যমে শত সহস্র সংকেত ও গোপন রহস্য সম্পর্কে আলোক লাভ হয়। যেখানে আল্লাহর অলিগন আল্লাহর জাত সত্তা গুনে গুনাহ্ন্যিত, রূপ রসে স্বভাবে একাকার। আল্লাহর চরিত্রে চরিত্রবান, ফানা ফিল্লায় উপনিত । তাই হাদিসে কুদসীতে আছে, আল্লাহ তার প্রিয় বান্দার হাত, পা, চোখ মূখ সমস্ত ইন্দ্রিয়ে পরিনত হয় যা দ্বারা সে কার্য সম্পাদন করে, মূলত তা আল্লাহই করেন। আর এই মুর্শিদের ধ্যান সাধানা মুলতঃ আল্লাহর সাধনা। তা না হলে, আল্লাহর ধ্যান কি উপায় কোন রূপে করবে বল? অনেকের মতে মুর্শিদের ধ্যান করা শিরক হারাম। তবে তারা বলুক আল্লাহর ধ্যান কি ভাবে করতে হয়? মোট কথা এদের ঈমান একিন সমন্ধে কোন ধারনাই নেই। আল্লাহর এবাদত তো পরের কথা!!
যা হোক, চুড়ান্ত সত্য হল এই যে, মোরাকাবাতে মুর্শিদের চেহারা ধ্যান করলে উপকার হয়। কারণ, মুরিদ যখন ধ্যানে আপন মুর্শিদের চেহারার মখোমুখি হয় তখন তার ভিতর বিশ্বাস, প্রেম এবং ধ্যান শক্তি—এ তিনটি মনাকর্ষক ও মহৎগুন সৃষ্টি হয়। এ তিনটি গুন একই সঙ্গে যখন মুর্শিদের নূরী অন্তর এবং প্রেমের দৃঢ় ধ্যান রাজ্যের আওতায় প্রেবেশ করে এবং এর প্রতিক্রিয়া মুরীদের অন্তরে এক প্রকার চম্বুক ও আকার্ষণ জম্মলাভ করে এবং প্রতিক্রিয়া মুরীদের আত্মার মধ্য দিয়ে তার সমগ্র দেহ তরঙ্গায়ি হয়। তখন আত্মাসহ মুরীদের সারা দেহ তা দ্বারা আলোক উদ্ভাসিত হয়। তাতে দিশারীরূপ ধ্যানের চাবির বদৌলতে মহামূল্যবান সম্পদ মুর্শিদের ইচ্ছার ভান্ডার খুলে যায় এবং মুর্শিদের ভিতর যে অনন্ত সম্পদ নিহিত রয়েছে মুরীদ তা থেকে অংশ পেতে শুরু করে।
আতরের সুবাস দূর থেকেই পাওয়া যায় এবং অনুভবও করা যায়। অনুরূপভাবে বারুদ ও দিয়াশলাইর মধ্যে সুপ্ত আগুনের মতো মুর্শিদের ভিতরও নেয়ামতসমূহ মজুদ রয়েছে। এ কারণে যথাযোগ্য মুর্শিদের সত্ত্বাও বারুদেরই মতো তেজঃদীপ্ত। এর সাথে প্রেমাগুন যুক্ত হলে তা আতশবাজির ন্যায় স্বীয় শক্তিতেই অন্যের মৃত্যু ঘটাতে পারে এবং পৃথিবীকে আলোকিত করতে পারে। ধ্যানের দ্বারা প্রেমাগুণ প্রজ্জালিত হয়। যে ধ্যান করে না সে প্রেম থেকে বঞ্চিত। প্রেমাগ্নি যখন মা’শুকের বারুদ অগ্নির সাথে মিলিত হয় তখনই প্রেমিক আতশবাজির আনন্দ অনুভাব করে। আতস বাজির সময় যেমন রং বেরংএর ঝাড় ফুল এবং আলো বিচ্ছুরিত হয় তেমনই মুর্শিদের ধনাগারেও নানারূপ ইস্কে এলাহীর নূর প্রজ্জ্বলিত হয়। এটা মুর্শিদের রূহের প্রভাব এবং বৈশিষ্ট্য।
কোর’আনে আল্লাহর নামের সাথে সাথে যে সব অনুকম্পার কথা বর্ণিত হয়েছে, ঠিক সে রকম মুর্শিদের সত্তাও আল্লাহর সে সব মহত্ব, পূর্নতা এবং মহব্বত দ্বারা পরিপূর্ণ। অতএব, মুর্শিদের সত্তার ধ্যান ও চর্যা করা হলে পবিত্র সূক্ষ্ম রূহের সূক্ষ্ম প্রভাব মুরীদের রূহ বা আত্মাকে প্রভাবিত করতে থাকে, যেমনই প্রেম আন্দোলিত হয় মা’শুকের স্মরণে। এভাবে যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রেমে নিমগ্ন হয় তার আত্মা প্রেম আগুনে দগ্ধ হয় এবং এর ফলে মা’শুকের নূরী রং তার মধ্যে চমকাতে থাকে। আশুক ও মাশুকের মধ্যে এরূপ একাত্মার সম্পর্ক অবশ্যই বর্তমান রয়েছে। তাঁদের মধ্যে দ্বন্দ্বমূলক ভাব থাকতেই পারে না। এটা করো কাছেই গোপন নেই যে মূলের বিরোধী হয়ে মূলে পৌছা যায় না। প্রত্যেক বস্তুই স্বঃস্বঃ মূলের সাথে সম্পর্কযুক্ত এবং মূলের দিকেই আকৃষ্ট।
ইশ্কে এলাহীর উৎস স্বয়ং আল্লাহ ও পরমসত্ত্বা বিধায় ইশ্ক বা প্রেম উক্ত সত্ত্বারই গুণ ও ফল। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ ভক্ত তাঁর থেকে তিনি যে শক্তি সামর্থ, জ্ঞান জ্ঞণাবলী ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য প্রাপ্ত হন তা সবই তাঁর সেই প্রেমাস্পদ আল্লাহর উদ্দেশ্যে নিবেদিত হয়। মাশুক সত্তার আকর্ষণ গুণেই এরূপ হয়। যে ব্যক্তি ‘শরাফতে হক্ক’ প্রাপ্ত হয়েছেন তিনি অতি সৌভাগ্যবান এবং শ্রেষ্ঠ সৌভাগ্যের অধিকারী। এ ‘শরাফতে হক্ক’এর প্রভাবে যার অন্তর আলোকিত হয়, তাঁর জ্ঞান গরিমা, গুণাবলী ও সত্তা সবই নূরময় রূপ ধারণ করে ফলে তাঁর দেহও নূরময় হয়। এটাই মা’শুকের প্রেমের মর্ম ও রূপায়ণ। অর্থাৎ আল্লাহর সত্তা ও বৈশিষ্ট্যবলী তাঁর প্রেমিকের সত্তায় রূপান্তরিত হয়। এ কারণেই তাঁকে ‘ফানা ফিল্লাহ’ অথবা ‘ বাকা বিল্লাহ’ বলা হয়। অর্থাৎ তাঁর দেহ-মন মা’শুকের সাথে লীন হয়ে স্থিতি প্রাপ্তি ।
এমতাবস্থায় তাঁর ইচ্ছা আল্লাহর ইচ্ছা, তাঁর জ্ঞান আল্লাহর জ্ঞান ইত্যাদি। আল্লাহ বলেন, “যারা আমাতে সাধনা করে আমরা তাদের আমাদের পথগুলো প্রদর্শন করা” অতএব, মুর্শিদও অবশ্য আল্লাহর সে সব বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলীর অধীকারী হবেন। এমতাবস্থায়, যেহেতু মুর্শিদ পরিপূর্ণরূপ তাওহিদি সত্তায় একাত্ম সেহেতু মুর্শিদের স্মরণ করলে আল্লাহরই স্মরণ হয়। এ জন্য ফানা ফিশশাইখ মুরীদের জন্য বেরায়েত। তাই তো মাওলানা রূম বলেন,( পীরের সত্তা যখন করিলে কবুল, এসে গোছে তোমার সত্তায় আল্লাহ্ ও রাসূল) আল্লাহ, রাসূল এবং আপন শাইখ বা মুর্শিদের চূড়ান্ত অবস্থা এক ও অভিন্ন। তাই তো হযরত মুজ্জাদ্দিদে আলফে সানী বলেন,( পীর তুয়াসত্ আওয়াল মা’বুদ তাসত্) অর্থাৎ তোমার পীরই তোমার প্রথম মা’বুদ। হযরত শাহ ওয়ালি উল্লাহ তাঁর কাওলুল জামিল পুস্তকে লেখেন— “প্রধান শর্ত হলো শাইখের সাথে মনঃসংযোগ স্থাপন এবং চেহারা নিরীক্ষন। আমি বলি আল্লাহর বহু প্রকাশ মাধ্যম আছে: তবে বোকা বা বিচক্ষণ আবেদ নয়। অথচ শাইখ তাঁর জুতাসহ মুরীদের মা’বুদ হয়ে আছে।
♥বাবা সুরেশ্বরী (রহঃ) রচিত
__"শিররে হক্ব জামে নূর "
“মাতলাউ’ল ঊলূম” কিতাব থেকে নেওয়া।
___ সংযোজন সম্পাদনায় (ফকির সাহেব)




0 Comments: