অনেক অনেক দিন আগের কথা। যাকে নাস্তিক্যবাদের জনক বলা হয় : মোটা চিন্তাধারার মোটা দর্শন প্রচার করতেন, যে মোটা দর্শন মোটা চোখে সবাই লুফে নিত; প্রকৃতি ও জীবনের সোজা ব্যাখ্যা যিনি দিয়ে গেছেন- তাঁর নাম চার্বাক। পশু-প্রকৃতি যে দর্শনের কথাটি শুনে নড়ে চড়ে উঠে এবং পচা প্রবৃত্তির মালিক যারা তারা পূর্ণ সমর্থন দেয় আর সেটা হলো, ‘যদি ধার করে ঘি খেতে হয় তবু ঘি খাও'। শিষ্য চার্বাককে প্রশ্ন করেছিল গুরু! ঘি যে খাব, পরে ধারের টাকা যদি দিতে না পারি তা হলে কী হবে? গুরু চার্বাক মুচকি হাসি সেরে শিষ্যকে বললেন, ধার শোধ করতে না পারলে দিও না। শিষ্যের প্রশ্ন, পাপ যে হবে, মহাপাপ! চার্বাক বললেন, পাপ বলে কিছু নাই, মহাপাপ তো দূরের কথা।










শিষ্য বললো, তা হলে যে মুনি-ঋষিরা এতকাল পাপ-পুণ্য শুনিয়ে এসেছে! চার্বাক বললেন, এগুলো মুনি-ঋষিদের বানানো কথা! আর মুনি-ঋষি বলে কিছু নাই, এরা নিরেট ভণ্ড। শিষ্য অবাক হয়ে বললো, ঘর-বাড়ি ছেড়ে, বিয়ে না করে, এই জঙ্গলে বসে বছরের পর বছর ধ্যানসাধনা করছে, এরপরও এরা ভণ্ড! চার্বাক বললেন, কিসের ধ্যান! কিসের সাধন! কিসের ভগবান! এসব ডাহা মিথ্যা কথা। জেনে রাখ, মানুষের সবচেয়ে বড় আবিষ্কারটি হলো ভগবান আবিষ্কার। কারণ ভগবান বলে কিছু নাই। তাই পাপ-পুণ্য বলেও কিছু নাই। দু' হাতে যা পাও খেয়ে যাও আর আনন্দফুর্তি কর। শিষ্য তো অবাক; বললো, ভগবান, পাপ পুণ্য এসব মিথ্যা! চার্বাক বললেন, হ্যাঁ এসব কেবল মিথ্যাই নয় বরং ডাহা মিথ্যা। নাস্তিক্যবাদের জনক চার্বাকের ঘি খাওয়াটা বড়ই পছন্দের বিষয়। উনি প্রচুর ঘি খান। ঘি খেতে খেতে চার্বাকের শরীর নাদুস নুদুস হয়ে গেল। আর সেই সঙ্গে সেই যুগের সব মুনি-ঋষিদের চৌদ্দ গুষ্ঠি শুদ্ধ ধুয়ে দিতেন। দিনে দিনেই চার্বাকের শিষ্যসংখ্যা বেড়ে যেতে লাগলো আর শিষ্যদেরকে নাস্তিক্যবাদের যত প্রকার কুকথা এবং কুকথা বলার ও শেখার জন্য ব্যাকরণ তৈরি করা যায় তাই তৈরি করা হলো। এখন গুরু চার্বাকের দরকার নাই, বরং শিষ্যরাই নাস্তিক্যবাদ আর মুনি-ঋষিদের ভণ্ড বলার নানান ধরনের কৌশল আবিষ্কার করলো। মুনি-ঋষিরা নীরব আর চার্বাকের শিষ্যরা সদা সর্বদা মুখরিত। প্রচার করতে লাগলো : আত্মাটাত্মা বলে কিছুই নাই। জীবাত্মা আর পরমাত্মা একথাগুলো সম্পূর্ণ বানানো কথা। কারণ ভগবান থাকলে তো আত্মার প্রশ্ন আসে। চার্বাক টক বেগুন (টমেটো সেদিনেও যে টক বেগুন ছিল তা জানা গেল) গাছের সঙ্গে একটি মানব জীবনের তুলনা করে চমক দেওয়া ব্যাখ্যা আর বিশ্লেষণ করে গেলেন। এক কথায়, টক বেগুনগাছ বড় হলে ফুল হয়, ফুল হতে টক বেগুন হয় তারপর পাকে আর আমরা সেই টক বেগুন খাই। তারপর টক বেগুন দিতে দিতে গাছটি মরে যায়। মরার বয়েস হলে শত চেষ্টা করেও আর বাঁচানো যায় না, কারণ এটাই প্রকৃতির বিধান-ইত্যাদি সব আজব আজব কথার বিশ্লেষণ। এত শিষ্য হয়ে গেল যে, চার্বাক খুশিতে বাগে বাগ। এদিকে ঘি খেতে খেতে চার্বাক গুরুজির আমাশয় রোগ হলো। সেদিনের কবিরাজ নামক ডাক্তারেরা চিকিৎসা দিয়ে ভালো করলো। আবার কিছুদিন পর একটু জটিল আমাশা। আবার চিকিৎসা। আবার ভালো। আবার আরও জটিল আমাশা। আবার আরও পরিশ্রমের চিকিৎসা। এভাবে আমাশার জটিলতা বাড়ছে আর চিকিৎসার পরিমাণটাও বাড়ছে। তারপর চার্বাকের রক্ত এবং আম জাতীয় দুই আমাশা। পায়ুপথ দিয়ে অবিরত রক্ত ঝড়ছে আর সেই সঙ্গে ভয়ঙ্কর আম যাচ্ছে। চার্বাক শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছেন। আর নড়তে চড়তে পারছেন না। এখন কেবল শুয়ে থাকতে হয়। শরীর খুবই দুর্বল, শরীর রক্তশূন্য, চোখ ফ্যাকাশে, বিবর্ণ চেহারা, কথা বলতে গিয়ে ঠোঁট কাঁপে। এবার কবিরাজ নামক বিখ্যাত ডাক্তারেরা অনেক প্রকার ঔষধ প্রয়োগ করলেও রোগমুক্তির কিছুই হলো না, বরং দিনে দিনেই রসাতলে যাচ্ছেন। অবশেষে বিখ্যাত কবিরাজ নামক ডাক্তারেরা বললো, গুরু চার্বাক, আমাদের চিকিৎসাবিদ্যা শেষ। এখন ভগবানকে ডাকুন অথবা মুনি-ঋষিদের ঝাঁড়-ফুঁক, পড়া পানি অথবা তাদের দেওয়া ঔষধ খেয়ে দেখতে পারেন। অনেক আধমরা রুগীকেও ভালো হতে দেখেছি। যাদেরকে চিকিৎসা নাই বলেছি তাদের অনেককেই শেষ চেষ্টা মনে করে মুনি-ঋষিদের জড়ি-বটি সেবন করে ভাল হতে দেখেছি। চার্বাক মনেপ্রাণে ডাক্তারদের কথায় বিশ্বাস করলেন। কারণ এখন তিনিই মৃত্যুপথযাত্রী। শুকিয়ে যাওয়া টক বেগুন গাছের অবস্থা। শিষ্যদেরকে কাছে ডাকলেন। কমবেশি সবাই আসলো। চার্বাক বললেন, দেখ শিষ্যরা, এক কাজ কর, আমাকে মহিষের গাড়িতে করে বিশ্বমিত্র মুনির আশ্রমে নিয়ে চল। আমার মন বলছে, বিশ্বমিত্র মুনির জড়ি-বটি সেবন করলে এবং তার দোয়াতে ভালো হয়ে যাব। কিন্তু তারপর? কী নির্মম চার্বাকের তকদির! কী নিষ্ঠুর নিয়তি! চার্বাকের দর্শনবাণী তার শিষ্যরা তারই মুখের উপর ছুড়ে মেরে বলে উঠলো, আমরা মুনি-ঋষি বিশ্বাস করি না,
দোয়া তো অনেক পরের কথা। চার্বাক অসহায়ের মতো চেয়ে রইল আর বললো, দর্শন ঠিকই আছে, কিন্তু দর্শনের ভেতর আরও অনেক বোবা দর্শন লুকিয়ে থাকে যার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ দেওয়া যায় না, পাঁচ ইন্দ্রিয় ধারণ করতে পারে না। কিন্তু— তারপরও থেকে যায়। শিষ্যরা সবাই বললো, গুরু, আমরা এগুলো বিশ্বাস করি না। কারণ এগুলো পচা কথা। পচা কথার নাম দর্শন নয়, বরং অন্ধবিশ্বাস। এভাবেই নাস্তিক্যবাদের জনক চার্বাকের জীবনপ্রদীপ নিভে গেল। কেউ মুনির' আশ্রমে নেওয়া তো বহু দূরের কথা, বরং নাক সিটকে অবিশ্বাসের চোখে চেয়ে হাসতে লাগলো। ঢাকাইয়া বলে, ‘হাড্ডিতে জুয়ানকালে গুদা বেশি থাকে তাই ফাল পাড়ে আর তরং বরং কথা কয়।'





                    ---------- বাবা কালান্দার জাহাঙ্গীর।

0 Comments: