হানাফি মাযহাবের শ্রেষ্ঠত্বে ইমাম-ই আ‘যম আবূ হানিফা (রা:

হানাফি মাযহাবের শ্রেষ্ঠত্বে ইমাম-ই আ‘যম আবূ হানিফা (রা:

হানাফি মাযহাবের শ্রেষ্ঠত্বে ইমাম-ই আ‘যম আবূ হানিফা (রা:)

খন্দকার মুহাম্মদ মোবারক হোসাইন

এম এফ, কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া কামিল মাদরাসা

ইমাম আ’যম (রা:) শুভ জন্ম, নাম-উপনাম ও বংশঃ-

আবু হানিফা নোমান ইবনে ছাবেত যওজী। ইমাম চতুষ্টয়ের মধ্যে অগ্রজ। মুসলিম সমাজে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা সর্বাধিক। জন্মকাল নিয়ে তিনটি মত আছে ১. ৬৩ হিজরী ২. ৭০ হিজরী ৩. ৮০ হিজরী। তৃতীয় মতটিই প্রসিদ্ধ। কেনান, ইমাম আ’যম (রা:)-র পৌত্র ইসমাইল ইবনে হাম্মাদ বলেন, ‘‘আমার দাদা ৮০ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন’’।৯/১ বাগদাদে ১৫০ হিজরীতে ওফাত। উপাধী ইমামে আযম। তাঁর নামের শাব্দিক অর্থ পর্যালোনায় দেখা যাবে তাঁর নামে ও কাজে পুরোপুরি মিল । আল্লামা ইবনে হাজার হায়তামী (রহ:) বলেন, অর্থাৎ ইমাম ঐকমত পোষণ করেন যে, তাঁর নাম নো‘মান। এতে এক গূঢ় রহস্য রয়েছে ১. নো‘মান এমন রক্ত, যা দ্বারা শরীরের কাঠামো প্রতিষ্ঠিতি থাকে। ২. কেউ কেউ বলেন, নো‘মানের অর্থ রুহ। ইমাম আবূ হানিফা (রা:) এর মাধ্যমে ফিক্হে ইসলামীর কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং ফিকহ শাস্ত্রের দলীলাদি ও বিভিন্ন দুরুহ বিষয়ের সমাধান মূল। ৩. নু’মান অর্থ লাল সুগন্ধিযুক্ত ঘাস বা বেগুনি রঙের নাম। সে হিসাবে ইমাম আবূ হানিফার (রা:) পবিত্র অভ্যাস ভাল এবং তাঁ গুণাবলি পূর্ণতার শীর্ষে পৌছেছে। ৪. নু’মান শব্দটি ‘‘ফু’লান’’ শব্দের ওযনে ‘‘নি’মাত’’ শব্দ থেকে নির্গত হয়েছে। তখন অর্থ হবে আল্লাহর পক্ষ থেকে ইমাম আ’যম মানুষের উপর এক বড় নিয়ামত।১০/২ প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পারস্যবাসীর এক ভাগ্যবান ব্যক্তির সুসংবাদ দিয়েছেন। সে হাদীসকে ইমাম মুসলিম (রহ:) হযরত আবূ হুরায়রা (রা:) থেকে বর্ণনা করেছেন। সরওয়ারে কায়েনাত হুজুর পুরনূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

لو كان الدين عند الثريا به رجل من فارس او قال من ابناء فارس حتى يتناوله-

-যদি দ্বীন সপ্তর্ষিমন্ডলস্থ সুরাইয়া সেতারার কাছে গচ্ছিত থাকে তখনও পারস্যবাসীর এক ব্যাক্তি তা অর্জন করে নেবে।১/৩

মুহাদ্দিসগণ বলেছেন এ হাদীসটি ইমাম আযম আবূ হানিফা (রা:) উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে। এতে কোনো আলেম দ্বিমত পোষণ করেননি।

হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী শাফেয়ী (রহ:) ‘‘তাবয়ীযূস সহীফা’’ কিতাবে এবং ইমাম ইবনে হাজর মক্কী (রহ:) ‘‘আল খায়রাতুল হিসান’’ এর মধ্যে ইমাম আযম আবূ হানীফার (রা:) ব্যাপারে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুসংবাদ শিরোনামে অধ্যায় রচনা করেছেন।

শৈশবকালঃ-

শৈশব কেটেছে বসরার কূফা নগরীতে। তৎকালীন ইসলামী নগর হিসেবে কূফা খ্যাতি কুড়িয়েছিল। এখানে বড় বড় আলেমের মজলিশ বসত। তন্মধ্যে ভাষা, সাহিত্য ও ব্যাকরণবিদগণ ছিলেন। প্রথমেই তিনি দর্শন শাস্ত্রের পাঠ শেষ করেন। পরবর্তীতে ফিকহ চর্চায় মনোনিবেশ করেন। হযরত হাম্মাদ (রা:) ছিলেন তৎকালীন একজন ফিকহ শাস্ত্রের গুরু, তিনি তাঁর মজলিশে প্রবেশ করেন। হযরত হাম্মাদ (রা:) ছিলেন হযরত আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা:) এর মূলধারার শিষ্য। ইমাম আবূ হানীফা (রা:) এর ওস্তাদ ছিলেন হযরত হাম্মাদ (রা:)। এবং হযরত হাম্মাদ (রা:) জ্ঞান আহরণ করেছেন হযরত ইব্রাহীম নখয়ী (রা:) থেকে। যিনি ছিলেন হযরত আলকামা (রা:) যোগ্য উত্তরসূরী। ১২০ হিজরীতে হযরত হাম্মাদ (রা:) ইন্তেকাল করলে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন হযরত ইমাম আবূ হানীফা (রা:) হযরত ইমাম আবূ হানীফা (রা:) এর নেতৃত্বে ও কতৃত্বেই কূফার বিদ্যাপীঠ পরিচালিত হতে থাকে। যাকে তৎকালীন ফোকাহায়ে কেরাম ‘‘কেয়াসের প্রতিষ্ঠান’’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। যুগশ্রেষ্ঠ আলেমগণ সেখানে হাজির হতে থাকেন। বসরা, মক্কা ও মদীনার আলেমগণ এ থেকে বাদ যাননি। আববাসীয় খলীফা আল মানসূর ক্ষমতায় এলে তাঁর এ বিদ্যাপীঠ বাগদাদে স্থানান্তরিত হয়। ওলামায়ে কেরাম তাঁর সাথে তর্ক-বিতর্ক ও গবেষণা করেন। তারা ইমাম আবূ হানীফা (রা:) থেকে জ্ঞান-পিপাসা নিবারণ করেন। সুবিখ্যাত মুহাদ্দিসদের মধ্যে আমীরুল মুমিনীন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক (র:), হাফস ইবনে গিয়াস (র:), ভুবন বিখ্যাত ফকীহ আবু ইউসূফ (র:), মুহাম্মদ যুফার (র:) হাসান ইবনে যিয়াদ (র:), খ্যাতিমান বুযূর্গ ও পীর ফুযায়েল ইবনে আয়াজ (র:), দাউদ তাঈ (র:) ছিলেন ইমাম আবূ হানীফা (রা:) -এর মজলিসের মধ্যমনি।

শিক্ষা জীবন ঃ-

ইমাম আবূ হানীফা (রাঃ) অসাধারণ মেধা ও স্মৃতি শক্তির অধিকারী ছিলেন। তাঁর বার কি তের বছর বয়সে সরওয়ায়ে কায়েনাত হায়াতুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিশিষ্ট খাদেম ও জলিলুল কবদর সাহাবী হযরত আনাস বিন মালেক (রাঃ) কুফায় আগমন করলে, তিনি তাঁর দরবারে উপস্থিত হতে থাকেন। তিনি প্রথমে পবিত্র কুরআন শরীফ মুখস্থ করেন। এরপর ইলমে কালামের দিকে মনোনিবেশ করেন। হিজরী ১০০ সালে তিনি হযরত হাম্মাদ (রাঃ) এর শিক্ষাকেন্দ্রে ভর্তি হন। ঐ বিদ্যালয়ে একাধারে ১০ বছর লেখা পড়া করেন। তারপর কুফায় তিনি মূহাদ্দিসগণের নিকট থেকে হাদীস সংগ্রহ করতেন।

জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় দক্ষতাঃ-

ইমাম আবূ হানিফা (রা:) ফিকহ শাস্ত্রের অদ্বিতীয় পন্ডিত ছিলেন। ফিকহ শাস্ত্র ছাড়াও ইলমে হাদীস, ইলমে কালাম, ইলমে বালাগাত, ইলমে নাহু, ইলমে সরফ, ইলমে তাফসীর প্রভৃতি বিষয়ে তিনি গভীর পান্ডিত্য অজর্ন করতেন।

তিনি শিক্ষাদান ও ফতোয়া রচনা কাজে ব্যস্ত থাকতেন।

শিক্ষকবৃন্দঃ-

আমাদের সমাজে লা-মাযহাবীরা বলে যে, ইমাম আযম আবূ হানিফা (রা:) মুহাদ্দিস ছিলেন না। অথচ তাঁর হাদীস শাস্ত্রে উস্তাদগণ ছিলেন প্রায় চার হাজার।

১. ইমাম আবূ আবদুল্লাহ ইবনে আবূ হাফস কবীর ইমাম আবূ হানিফা ও ইমাম শাফেয়ীর শিষ্যদের মধ্যকার একটি তর্ক তুলে ধরে লিখেছেন, -(এক সময়) ইমাম শাফেয়ীর শিষ্যগণ ইমাম শাফেয়ীকে ইমাম আবূ হানিফা (রা:)-র উপর মর্যাদা দিচ্ছিলেন, আবূ আবদুল্লাহ ইবনে আবূ হাফস হানাফি শাফেয়ীগণকে বলেন, ‘‘তোমরা ইমাম শাফেয়ীর শিক্ষকগণের গণনা করে বল তা কত’’? তাঁরা তখন গণনা করে বললেন, ‘‘আশিজন’’। তখন হানাফিরা ইমাম আবূ হানিফার ওলামা ও তাবে‘ঈ-শিক্ষক গণনা করলেন, তাঁদের সংখ্যা বের হল ‘‘চার হাজার’’। তখন আবূ আবদুল্লাহ বলেন, ‘‘এটা ইমাম শাফেয়ীসহ অন্যান্য ইমামদের উপর ইমাম আবূ হানিফার সামান্য মর্যাদা’’।৬/৪

২. ইমাম সাইফুল আয়িম্মা সাবেলী বলেন, ‘‘নিশ্চয় ইমাম আবূ হানিফা চার হাজার তাবে‘ঈ মাশায়েখ থেকে শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছেন’’।৭/৫

৩. ইমাম ইবনে হাজর মক্কী শাফেয়ী (রহ:) ইমাম আ’যমের মাশায়েখের আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, ইমাম আবূ হানিফার (রা:) অনেক শিক্ষক ছিলেন। ইমাম আবূ হাফস তাঁদের থেকে চার মাশায়েখের গণনা করেছেন। কেউ বলেন, শুধুমাত্র তাঁর তাবে‘ঈ মাশায়েখের গণনা চার হাজার।৮/৬

ছাত্রবৃন্দঃ-

‘‘মু‘জামুল মুসান্নেফীন’’ গ্রন্থে ইমাম আবূ হানিফা (রা:) এর আটশত আশিজন শিষ্য ছিলেন যারা প্রত্যেকই স্বীয় যুগে বিখ্যাত ফকীহ ছিলেন। তাদের মধ্যে কতিপয় শিষ্যগণের নাম উল্লেখ করা হলোঃ-

১. আমর ইবনে মাইমুনা (রহ:), ২. ইমাম যুফার (রহ:), ৩. হামযযাহ ইবনে হাবীব (রহ:), ৪. সূফীকুল শিরমণি দাউদ তায়ী (রহ:), ৫. আফিয়াহ ইবনে ইয়াযদী (রহ:), ৬. মিন্দল ইবনে আলী (রহ:), ৭. ইব্রহীম ইবনে তাহমান (রহ:), ৮. হাববান ইবনে আলী (রহ:), ৯. নূহ ইবনে আবূ মরিয়ম আলজামে (রহ:), ১০. কাসেম ইবনে মায়ান (রহ:), ১১. হাম্মদ ইবনে আবূ হানিফা (রহ:), ১২. আবদুল্লাহ ইবনে মোবারক (রহ:), ১৩. ইয়াহইয়া ইবনে যাকারিয়া ইবনে আবূ যায়েদাহ (রহ:), ১৪. কাযীউল কুযাত ইমাম আবূ ইউসুফ (রহ:), ১৫. ইমাম শাফেয়ী (রহ:) এর ওস্তাদ ওকী (রহ:), ১৬. আসাদ ইবনে ওমর (রহ:), ১৭. আলী ইবনে মুসাহহার (রহ:), ১৮. ইউসুফ ইবনে খালেদ (রহ:), ১৯. মুহাম্মদ ইবনে হাসান শায়বানী (রহ:), ২০. ফজল ইবনে গিয়াস (রহ:), ২১. হাফস ইবনে মুষা (রহ:), ২২. ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ (রহ:), ২৩. হাসান ইবনে যিয়াদ (রহ:), ২৪. ইয়াযাদ ইবনে হারুন (রহ:), ২৫. আব্দুর রাজ্জাক ইবনে হুমাম (রহ:), ২৬. আবূল কাসেম ইবনে নবীল (রহ:), ২৭. ষাঈদ ইবনে আউস (রহ:), ২৮. ফযল ইডবনে ওকী (রহ:) প্রমুখ।

কর্ম জীবনঃ-

জীবন ধারনের জন্য তিনি কাপড়ের ব্যবসা করতেন। যৌবনে তিনি বিদ্যা শিক্ষার চেয়ে ব্যবসায়ের প্রতি অধিক অনুরাগী। একদিন ইমাম শাবী (রহ:) বললেন, তোমার মধ্যে প্রতিভা আছে, তুমি আলেমদের সাথে ওঠা-বসা কর। এ উপদেশের পর তিনি বিদ্যানুরাগী এবং জ্ঞান সিন্ধুর অমূল্য রত্ন অজর্ন করেন।

চরিত্র ও ইবাদতঃ-

তিনি একজন অসাধারণ প্রতিভাবান অভিজ্ঞ, জ্ঞানী ও উন্নত চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। তাক্বওয়া, পরহেযগারী, আল্লাহর নৈকট্য লাভে ঐকান্তিক প্রচেষ্টা, আত্ন-চেতনা, দৃঢ় চিন্তা, ন্যায় পরায়নতা, আল্লাহর যিকিরসহ ইবাদতের প্রতি প্রবল অনুরাগ,প্রভৃতি ক্ষেত্রে তিনি দৃষ্টান্ত স্বরূপ ছিলেন। তিনি রাত্রি জাগরণ ও স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে ইবাদত করার কারণে লোকে তাঁকে খুঁটি বলে আখ্যায়িত করতো। মক্কী ইবনে ইবরাহীম বলেন,

كان جهاد كله من حياته الى القبر

তাঁর জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জীবনটাই ছিল জিহাদের।

সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) এর সাথে সাক্ষাত লাভঃ-

ইমাম আযম আবূ হানিফা (রা:) চারজন সাহাবীর সাক্ষাত লাভে ধন্য হন। তাঁরা হলেন, ১. হযরত আনাস বিন মালিক (রা:), ২. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আবূ আওফা (রা:), ৩. সাহল ইবনে সা‘দ (রা:), ৪. আবূ তোফাইল (রা)।

ইমামে আযমের (রা:) এর ব্যাপারে অপপ্রচার :-

ডিজিটাল যুগের ডিজিটাল চিন্তাভাবনা। চলছে ডিজিটালভাবে মাসআলার সমাধান দেয়া। মিডিয়ায় কিছু দাঁড়ি, টুপি, পাঞ্জাবী পরিহিত নামধারী মৌলভী। অবস্থা দেখলে মনে হয় মিডিয়ার হাত-পা ধরে বসে আছে। যার কারণে কিতাব পড়ার সময় তাদের নেই। যারা তাদেরকে টাকা-পয়সা দিয়ে যেভাবে বলতে বলছে তারা সেভাবে সেখানে বলে যাচ্ছে, যার কারণে তাদের বলার সাথে কিতাবের এবারতের কোন মিল পাওয়া যাচ্ছে না। এখন বলে একটা তখন আরেকটা। ঠিকমতো কিতাবের নামগুলোও বলতে পারবে না। যে কয়টা কিতাবের নাম উল্লেখ করে তাও কথার ধরনে মনে হয় শুধু কিতাবের নামগুলোই কেবল মুখস্ত। আবার মাঝে মধ্যে অনেককে দেখা যায় যাদের পরনে পেন্ট-শার্ট, মুখে প্রিন্স কাটিং দাঁড়ি কখনো টুপি আছে আবার কখনো টুপি নাই। নামাজ পড়ে নামাজের ধরনে মনে হয় তার নামাজ দেখলে তাকে বড় নামাজী বলবে। তাদেরকে বেশীর ভাগ সময় রাস্তায় দেখা যায় ঘুরে ঘুরে সরলমনা সাধারণ মুসলমানদেরকে গুমরা করার প্রয়াস চালাচ্ছে। সত্যিকার অর্থে কুরআন-হাদীসের কোন জ্ঞান তাদের কাছে নেই। অথচ কথা-বার্তা শুনলে মনে হয় তারাই মহাজ্ঞানী।

তারা ও মিডিয়ার ঐ নামধারী মৌলভীদের স্লোগান এক -‘‘ইমাম আবূ হানীফা হাদীস জানতেন না। তিনি সহীহ হাদীস বাদ দিয়ে দুর্বল হাদীস বর্ণনা করতেন।’’ সেই কারণে তারা ইমাম আবূ হানীফা (রা:) এর মাঝহাব বাদ দিয়ে সহীহ হাদীসের উপর আমল করতে শুরু করেছে। এবং তাদের মাযহাবের নাম দিয়েছে ‘‘লা-মাযহাবী’’। বাংলা বুখারী পড়ে ওখানে তারা সহীহ হাদীস পেয়েছে নবীজি رفع اليدين করতেন, তাদের কথা ‘‘বুখারী শরীফে পাঁচটি সহীহ হাদীস আছে নবীজি رفع اليدين করেছেন এখন কার কথা মানব নবীজির কথা না ইমাম আবূ হানীফা (রা:) এর কথা’’। এ নিয়ে তারা কুমড় বেঁধে মাঠে নেমেছে। অথচ তারা যে বুকার স্বর্গে বাস করছে তার সামান্যতম খবরও তাদের নেই। মেইন বুখারী শরীফের মধ্যে আমরা যে পাঁচটি হাদীস শরীফ দেখতে পাই যে নবীজি رفع اليدين করেছেন, সেই বূখারী শরীফের হাদীসগুলোর পাশেই হাশীয়ায় স্পষ্ট ভাষায় লেখা –

واجابوا عن حديث الباب ونحوه بانه محمول على انه كان فى ابةدا ء الاسلام ثم نسخ والدليل عليه ان عبدالله بن الزبير رضى الله عنه راى رجلا يرفع يديه فى الصلوة عند الركوع وعند رفع رأسه من الركوع فقال لا تفعل بذلك الشئ فعله رسول الله صلى الله عليه وسلم ثم تركه ويويد النسخ ما رواه الطحاوى بسند صحيح حدثنا ابن ابى داود قال انا احمد بن عبد الله ابن يونس قال انا ابو بكربن عياش عن حصين عن مجاهد قال صليت خلف ابن عمر فلم يكن يرفع يديه الا فى الةكبيرة الاولى من الصلوة-

অর্থাৎ: তরজুমাতুল বাব ও অন্যান্য জায়গায় বর্ণিত হাদীসের জবাব প্রদান করে ওলামায়ে কেরাম বলেন: উল্লেখিত হাদীস সমূহের উপর ইসলামের প্রথম যুগে আমল করা হত, পরবর্তীতে তার আমল রহিত হয়ে যায়। আমল রহিত হওয়ার দলিল হিসেবে উল্লেখ রয়েছে যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা:) তিনি এক ব্যক্তিকে দেখতে পেলেন নামাযে রুকুতে যাওয়ার সময় ও উঠার সময় হাত উত্তোলন করতেছেন এটা দেখে তিনি নামাযী ব্যক্তিকে বললেন তুমি রুকুতে যাওয়ার সময় এবং উঠার সময় হাত উত্তোলন করিও না, কেননা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম দিকে এ আমল করলেও পরবর্তীতে তা বর্জন করেন। আর এই আমল রহিত হওয়ার দলীল ইমাম ত্বহাভী (রা:) সহীহ সূত্রে হাদীস বর্ণনা করে বলেন- আমাকে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ইবনে আবী দাউদ (রা:), তিনি বর্ণনা করেছেন হযরত আহমদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে ইউনূস (রা:) হতে, তিনি বর্ণনা করেছেন হযরত আবু বকর ইবনে আয়াশ (রা:), তিনে বর্ণনা করেছেন হযরত হুসাইন (রা:) হতে, তিনি বর্ণনা করেছেন হযরত মুজাহিদ (রা:) হতে, তিনি বলেন- আমি আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা:) এর পিছনে নামাজ আদায় করেছি, তিনি তাকবীরে ঊলা ব্যতীত কোন সময় হাত উত্তোলন (রফয়ে ইয়াদাইন) করেননি।

সত্যিকার অর্থে কুরআন-হাদীস সম্পর্কে তাদের সঠিক জ্ঞান নেই। এবং ইমাম আবূ হানীফা (রা:) এর জ্ঞান সম্পর্কেও তাদের কোন ধারনা নেই। ইমামে আযম আবূ হানীফা (রা:) যেভাবে প্রত্যেকটি বিষয়ের সমাধান দিয়েছেন আজ পর্যন্ত কেউ এতসুন্দর সামাধান দিতে পারেনি এবং উনার প্রদত্ত সমাধান আদৌ পর্যন্ত কেউ খন্ডাতে পারেনি।

ইমাম আওযায়ী (রা:) যিনি ইমাম আবূ হানীফা (রা:) এর সমকালীন মুজতাহিদ ও মুহাদ্দিস ছিলেন তিনি একবার হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রা:) কে বলেন- من هذا المبةدع الذى خرج بالكوفة فيكنى اباحنيفة ‘‘কূফায় গজিয়ে উঠা এই বেদাতীর পরিচয় কি? যাকে আবূ হানীফা উপনামে ডাকা হয় ’’?

ইমামে আযম আবূ হানীফা (রা:) এর প্রাণাধিক শিষ্য ইবনে মুবারক এ কথা শুনে চুপ থাকেন, এ সময় তিনি কিছু জটিল ও দুর্বোধ্য মাসআলা বর্ণনা করেন এবং সর্বজনগ্রাহ্য ফতোয়ার দিক নির্ণয় করেন। ইমাম আওযায়ী (রা:) বিস্ময় বিমূঢ় হয়ে বলেন কে দিয়েছে এই ফতোয়া? ইবনে মুবারক বলেন ইরাকের জনৈক শায়খ যার সাক্ষাতে এই মাসআলা ও ফতোয়া জেনেছি। ইমাম আওযায়ী (রা:) বলেন যিনি এই ফতোয়া দিয়েছেন তিনি মাশায়েখকুল শিরমণি। যাও তার কাছে গিয়ে আরো দ্বীনি এলেম শিখ। ইবনে মুবারক বললেন- সেই শায়খের নাম আবূ হানীফা। পরবর্তীতে মক্কায় ইমামে আযমের সাথে ইমাম আওযায়ী (রা:) এর সাক্ষাৎ হয় এবং অনেক মাসআলা নিয়ে আলোচনা (তর্ক-বিতর্ক) হয়। অবশেষে ইমাম আওযায়ী (রা:) ইমাম আবূ হানীফা (রা:) সম্পর্কে বলেন-

غبطت الرجل بكثرة علمه ووفورعقله واستغفرالله تعالى لقد كنت فى غلط ظاهر والزم الرجل فانه بخلاف ما بلغنى عنه-

‘‘লোকটার গভীর জ্ঞান ও অসামান্য বুদ্ধি বিবেকের প্রতি খামোখাই সমালোচনার তীর ছুড়েছি। এজন্য আল্লাহর কাছে পানাহ চাই। সত্যি বলতে কি আমি প্রকাশ্য ভুলের মাঝে ছিলাম। মহামানবের চরিত্রে এলজাম দিয়েছিলাম। লোকমুখে যা শুনেছি এর থেকে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম।’’২/৭

লোকমূখে শুনে ইমাম আওযায়ী (রা:) ইমাম আবূ হানীফা (রা:) সর্ম্পকে সঠিক ধারনা পোষন করেননি। কিন্তু যখন ইমাম আবূ হানীফা (রা:) এর গভীর জ্ঞানের কথা শুনলেন তখন তিনি তাকে মাশায়েখকুল শিরমণি বলেছেন। আর আজকে যারা ইমাম আবূ হানীফা (রা:) সর্ম্পকে মন্তব্য করার মত দু:সাহস করে তাদের অস্তিত্ব ঠিক আছে কিনা খবর নাই। অবস্থা দেখে মনে হয় তারা আধুনিক যুগের সংস্কারক।

ইমাম আবূ হানীফা (রা:) সম্পর্কে যারা কটাক্য করছে। যারা বলতে চায় ইমাম আযম হাদীস জানতেন না। তাদের সকলের জ্ঞান-চিন্তাভাবনা এক করলে ইমাম আবূ হানীফা (রা:) এর এক ফুটা ঘামের সমান হবে না। অথচ তারা আজ ইমাম আবূ হানীফা (রা:) সর্ম্পকে বিভিন্ন রকম মন্তব্য করে।

ইমামে আযম আবূ হানীফা (রা:) এর জ্ঞান দেখুন তিনি কত গভীর জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন, তিনি সেই ইমাম যিনি মাসআলাসমূহের উসূল বের করতেন। আর সেই উসূলের ভিত্তিতে আনুসঙ্গিক হাজারো মাসআলার উন্মেষ ঘটাতেন। শুধু তাই নয় তিনি এমন ইমাম যিনি ঘটনা ঘটার আগে ঘটিতব্য বিষয়ের সমাধান বের করে রাখতেন।

তিনি বলেন, আমার পূর্বসূরীগণ যে ব্যাপারটাতে খুব একটা আমল দিতেন না। অনেকে এটা পছন্দও করতেন না। একে মনে করতেন সময়ের অপচয়। অযথা মানুষকে হয়রানীর উপকরণ। হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রা:) কে কোন এক ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলতেন ‘‘এমন ঘটনা ঘটেছে কি? তারা যদি বলত, ঘটেনি তখন তিনি বলতেন, ঘটবার আগ পর্যন্ত ব্যাপারটা সম্পর্কে চুপ থাক।’’

ইমামে আযম (রা:) বলেন, আমার মতাদর্শ এক্ষেত্রে ভীন্ন, কেননা, ফকীহগণের কাজই হল ঘটনার আগে ঘটিতব্য বিষয়ের সমাধান যথাসম্ভব বের করে রাখা।৩/৮

ইমাম আবূ হানীফা (রা:) কত গভীর জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। তাঁর চিন্তাভাবনা কত সূক্ষ্ম। আরেকটি ঘটনা দেখুন-

একবার হযরত কাতাদাহ (রা:) কূফায় এলে ইমাম আবূ হানীফা (রা:) তাকে অভ্যর্থনা জানান। এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, হে আবুল খাত্তাব! সেই মহিলার ব্যাপারে আপনার মত কি যার স্বামী তার থেকে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত আর সে নারী মনে করছে তার স্বামী মারা গেছে। পরে সে বিবাহ বসেছে অন্য কোথাও, ইতোমধ্যে তার প্রথম স্বামী ফিরে এসেছে? এই মহিলার মোহরানাইবা কী হবে?

ইমাম আযম (রা:) বলেন আমি আমার শিষ্যবৃন্দকে বলে রেখেছিলাম এ মাসআলায় তিনি যদি কোন হাদীস পেষ করেন তাহলে মনে করবে তিনি মিথ্যা বলেছেন। পক্ষান্তরে যদি যুক্তির আশ্রয় নেন তাহলে দেখবে ভুল করেছেন। হযরত কাতাদা (রা:) বলেন, ‘‘এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে কি?’’ বললাম না, তিনি বললেন যা ঘটেনি সে বিষয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করছ কেন? আমি বললাম মুসিবত আসার আগে ভাগেই আমরা উপায়-উপকরণ বের করে রাখি। কাজেই ওই ঘটনা এসে গেলে আমরা এর প্রতি বিধান করি। হযরত কাতাদা (রা:) আমার কথার কোন উত্তর দিলেন না।

ইমাম আবূ হানীফা (রা:) বলেন, আল্লাহ পাক রাববুল আলামীনের অসীম কুদরতে যে কোন মাসআলার সূক্ষাতিসূক্ষ্ম সমাধান দেয়ার যোগ্যতা দান করেছেন। যে বা যারা যখনই আমাকে কোন ব্যাপারে আটকাতে কিংবা ঠকাতে চেয়েছেন আল্লাহ পাক তখনই আমাকে উপস্থিত জ্ঞান দান করতেন, যদ্দারা আমি এইসব মাসআলার যথাযথ উত্তর দিয়েছি।

এ কারণেই ইমাম আযম আবূ হানীফা (রা:) সম্পর্কে দারুল হিজরতের (মদীনার) ইমাম মালেক (রা:) বলেন-

هذا رجل لو اراد أن يتم الدليل على ان هذه السارية من ذهب لاستطاع-

অর্থাৎঃ ‘‘যদি এই লোকটা কাঠের পালঙ্গকে যুক্তি দিয়ে স্বর্ণ বানাতে চান, পারবেন’’।৪/৯

আবার কখনও শুনা যায় তারা বলে আবূ হানিফা (রা:) হাদীস ছেড়ে দিয়ে কিয়াসের উপর আমল করেন। এটা সম্পূর্ণ বানোয়াট কথা। আসলে এরা এখন যেমন তখনও এদের এজেন্ডা ছিল। যেমন : ইমাম আ’যমের (রা:) প্রসিদ্ধ শিষ্য আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক ইমাম আয’ম (রা:) ও ইমাম বাকের (রা:) এর সাথে সাক্ষাত লাভের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ইমাম আ’যম (রা:) হযরত ইমাম বাকের (রা:) এর সাথে মদীনা শরীফে সাক্ষাত লাভ করেন। ইমাম আ’যমের উপর অনেক ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি হাদীস ছেড়ে দিয়ে কিয়াসের উপর আমল করার অপবাদ দেন, তাই যখন সাক্ষাত হয় তখন ইমাম বাকের (রা:) ইমাম আ’যম আবূ হানীফা (রা:) থেকে জিজ্ঞেস করলেন,

انت الذى خالفت أحاديث جدي صلى الله عليه وسلم بالقياس؟

-আপনি কি ঐ ব্যক্তি যে অনুমানের উপর আমার নানাার হাদীসের বিরোধীতা করেন?

ইমাম আ’যম (রা:) বলেন, আল্লাহর পানাহ্! আপনি তাশরীফ রাখুন, আমি আপনাকে আরয করি, আপনার ইজ্জত ও হুরমাত আমাদের উপর এত জরুরী, যে রকম আপনার দাদার ইজ্জত রক্ষা সাহাবীদের উপর জরুরী ছিল। তখন ইমাম বাকের (রা:) তাশরীফ রাখলেন ইমাম আ’যমও তাঁর সামনে বসলেন এবং আরয করলেন, আমি আপনার থেকে তিনটি কথা জানতে চাই, আপনি তাঁর সমাধান দেবেন? প্রথম প্রশ্ন হল- ‘‘পুরুষ দুর্বল না মহিলা দুর্বল’’? তিনি বললেন, মহিলা। অতঃপর ইমাম আবূ হানীফা (রা:) জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘মহিলাদের মীরাসে কত অংশ’’? তিনি বললেন, মহিলার অংশ পুরুষের অর্ধেক। এ উত্তর শুনে ইমাম আবূ হানীফা (রা:) বললেন, -এটা আপনার নানার ইরশাদ, যদি আমি কিয়াসের মাধ্যমে আপনার নানার কথাকে পরিবর্তন করতে চাইতাম তখন পুরুষকে এক অংশ দিতাম ও মহিলাকে ডাবল দিতে বলতাম। কেননা, মহিলা পুরুষের চেয়ে দুর্বল।

অতঃপর ইমাম আ’যম (রা:) দ্বিতীয় প্রশ্ন তুলে ধরলেন, ‘‘নামায উত্তম, না রোযা’’? ইমাম বাকের (রা:) বলেন, ‘‘নামায’’। তখন আবূ হানীফা (রা:) বলেন, -এটা আপনার নানার ইরশাদ, যদি আমি কিয়াসের মাধ্যমে আপনার নানার দ্বীনকে পরিবর্তন করতে চাইতাম, মহিলা যখন হায়েয থেকে পবিত্রতা অর্জন করবে তখন যুক্তি দিয়ে বলতাম, সে রোজা কাযা করার পরিবর্তে যেন নামায কাযা করে।

অতঃপর ইমাম আ’যম (রা:) তৃতীয় প্রশ্ন করলেন, ‘‘পেশাব বেশী নাপাক, না বীর্য’’? ইমাম বাকের (রা:) বলেন, ‘‘পেশাব’’। তখন ইমাম আ’যম (রা:) বললেন, -যদি আমি যুক্তি দিয়ে আপনার নানার কথা পরিবর্তন করতে চাইতাম, তখন আমি ফতওয়া দিতাম পেশাব করলে গোসল করতে হবে এবং বীর্য বের হলে অযূ করতে হবে। কেননা পেশাব বীর্য থেকে বেশী নাপাক। কিন্তু আমি আপনার নানার ধর্ম পরিবর্তন করা থেকে আল্লাহর আশ্রয় কামনা করছি।

এ কথা শুনা মাত্র ইমাম বাকের (রা:) নিজ আসন থেকে উঠে আবূ হানীফার (রা:) সাথে আলিঙ্গন করলেন এবং কপালে চুমু খেলেন।৫/১০

এ বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় যে, ইমাম আ’যমের কুরআন ও হাদীস অনুধাবন এবং দূরদর্শিতার বিপরীতে বিরোধীরা তাঁর বিরুদ্ধে এত অভিযোগ উত্তাপন করেছিল যে ইমাম বাকের (রা:)-র মত লোকও তাঁর ব্যাপারে সংকোচ প্রকাশ করেছেন। যখন ইমাম আ’যম বিভিন্ন উপমার মাধ্যমে দূরদর্শিতা প্রকাশ করলেন তখন ইমাম বাকের (রা:) শুধু নিজ অভিযোগ প্রত্যাহার করেননি; বরং ইমাম আ;যমের জ্ঞানের গভীরতার স্বীকৃতি দিলেন। তার সমর্থনে নিম্নেক্ত র্বণনাও বিদ্যমান।

এক সময় ইমাম আ’যম (রা:) মক্কা মুকাররামায় ইমাম মুহাম্মদ বাকের (রা:)-র নিকট উপস্থিত হলেন তখন তিনি ইমাম আ’যম আবূ হানিফা (রা:) কে দেখে বলেন! আবূ হানিফা! আপনাকে দূরদৃষ্টি দিয়ে দেখতেছি- আপনি আমার নানার মুছে যাওয়া সুন্নাতকে জিবীত করবেন। আপনি প্রত্যেক দঃখীকে সাহায্য করবেন এবং প্রত্যেক বিপদগ্রস্থকে সাড়া দিবেন। বিপদগ্রস্থলোক যখন নিরুপায় হবে তখন আপনার শরণাপন্ন হবে। আপনি পথহারা ব্যক্তিদেরকে পথের দিশা দিবেন। আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ সাহায্যপ্রাপ্ত হবেন। এমনকি আপনি রাস্তায় আল্লাহওয়ালাদের সাথে থাকবেন।১১

ইমামে আযম আবূ হানীফা (রা:) এর জ্ঞান দেখুন,

একদা তাঁর কতিপয় ছাত্র একটি জটিল মাসয়ালা নিয়ে ইমাম আযম আবূ হানিফা (রা:) এর নিকট আসলেন এবং বললেন হুজুর একটি কুকুর ও একটি বকরি মেলামেশা করার কারণে একটি বাচ্চা প্রসব করল। যার মাথার অংশ কুকুরের মত আর পিছনের অংশ বকরির মত হয়েছে , এমতবস্থায় এই পশুর বিধান কি? ইমাম আবূ হানিফা (রা:) বললেন তোমরা একটি বাটিতে মাংস ও আরেকটি বাটিতে ঘাস নিয়ে আস। এরপর ঐ পশুকে ছেড়ে দাও সে যদি ঘাস খায়, তাহলে মাথার অংশটা বাদ দিয়ে বাকি অংশ খাওয়া জায়েয। আর যদি মাংস খায় তাহলে সম্পূর্নটা খাওয়া না জায়েয। ছাত্ররা বলল হুজুর পুশুটি মাংস খায়, ঘাস খায়, এমতবস্থা এর বিধান কি? ইমাম আবূ হানিফা (রা:) বললেন একটি বেত নিয়ে এসে পশুটিকে প্রহার কর। যদি পশুটি কুকুরের মত ঘেউ ঘেউ করে তাহলে তা খাওয়া না জায়েয, আর যদি বকরির মত চিৎকার করে তাহলে মাথার অংশটা বাদ দিয়ে বাকি অংশ খাওয়া জায়েয।

মাঝহাব মানতে যাদের সমস্যা বা যারা মাঝহাব মানা লাগবে না বলেন তাদের কাছে জানতে চায় উপরুক্ত মাসআলার সমাধান কোন জায়গা থেকে দিবেন। সুতরাং সহসেই বলা যায় মুজতাহিদগণ ইজতেহাদ করে আমাদেরকে মাসআলার সমাধান দিয়ে গেছেন সেই সমাধানের উপর আমরা আছি। লা-মাঝহাবী সম্প্রদায়রা বুখারী বুখারী বলতে বলতে তাদের ‘‘বুখার’’ ঁজ্বর এসে যায় তারা আবার ইমাম আযম সম্পর্কে মন্তব্য করে অথচ দেখুন, ইমাম বুখারী (রহ:) ইমাম আ’যম আবূ হানিফা (রা:) সম্পর্কে বলেন -‘‘মুহাদ্দিসগণ তাঁর থেকে বর্ণনা করণে, তাঁর মতামত গ্রহণে ও তাঁর হাদীস গ্রহণ করণে নিশ্চুপ ছিলেন’’।১২

তাই সবশেষে একথাই বলব, যারা বলেন ইমাম আবূ হানিফা (রা:) হাদীস জানতেন না। তাদের এই কথার কোন ভিত্তি নেই। বরং যারা এই সমস্ত কথা বলে তাদের জ্ঞান-চিন্তাভাবনা যেখানে শেষ ইমাম আযম আবূ হানীফা (রা:) এর জ্ঞান-চিন্তাভাবনা সেখান থেকে শুরু। ইমাম আবূ হানীফা (রা:) সম্পর্কে কোন মন্তব্য না করা এবং তাঁর প্রদত্ত মাসআলা তথা হানাফী মাযহাব অনুসারে নিজের জীবনকে বাস্তবায়ন করাই একজন আলেম ও প্রকৃত জ্ঞানীর কাজ। আল্লাহ পাক আমাদেরকে সহীহ বুঝ ও সে অনুযায়ী আমল করার তাওফীক দান করুন।

আমীন! বিহুরমাতি সায়্যিদিল মুরসালিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

তথ্যসূত্রঃ

০১. খতিবে বাগদাদী : তারিখে বাগদাদ, ১৩/৩২৬।

০২. ইবনে হাজর মক্কী : আল খাইরাতুল হিসান, পৃষ্ঠা : ৩১।

০৩. মুসলিম শরীফ : আস সহীহ, কিতাবু ফাযায়িলিস সাহাবা, باب فضل فارس ৪/১৯৭২, হাদিস : ২৫৪৬।

০৪. মুফেক : মানাকিবুল ইমামিল আ’যম আবী হানিফা, ১/৩৮, ইবনে বায্যায করদরী : মানাকিবুল ইমাম আ’যম আবী হানিফা, ১/৬৮।

০৫. খাওয়ারেযমী : জামেউল মাসানিদ, ১/৩২।

০৬. ইবনে হাজর মক্কী : আল খাইরাতুল হিসান, পৃষ্ঠা : ৩৬।

০৭. আস সাহমূল মুসীব ফী তানিবিল খতীব।

০৮. তারীখে বাগদাদ,১৩ খন্ড, ৩৪৮ পৃষ্টা।

০৯. ইবনে হাজর মক্কী : আল খাইরাতুল হিসান, পৃষ্ঠা : ।

১০. মুফেক : মানাকিবুল ইমামিল আ’যম আবী হানিফা, ১/১৬৮, ইবনে হাজর মক্কী : আল খাইরাতুল হিসান, পৃষ্ঠা : ৭৬, আবূ যাহারা : আবূ হানীফা, পৃষ্ঠা : ৭১।

১১. করদরী : মানাকিবুল ইমামিল আ’যম আবী হানিফা, ১/৩১।

১২. বুখারী : আত তারিখুল কবীর, ৮/৮১।

0 Comments: