বিশ্ব পরিচালনায় আল্লাহর ওলীদের ভূমিকা

মহান আল্লাহতালা হযরত রসূলে করিম (দঃ)-কে এ ধরাধামে পাঠিয়েছেন সমগ্র বিশ্বের সকল মানবজাতির মুক্তি ও হেদায়েতের লক্ষ্যে পবিত্র সওগাত ইসলাম ধর্ম প্রতিষ্ঠাকল্পে। সৈয়দুল মোরছালীন হযর মোহাম্মদ মোস্তফা আহমদ মোজতবা (সঃ) এ পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছিলেন সারা বিশ্বের রহমত বা আশীর্বাদ রূপে। কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক অনুশীলনের মাধ্যমে কিভাবে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায়, জগৎ ও জীবনকে সুন্দর কারা যায় এবং স্রষ্টাকে পাওয়া যায় তিনি বিশ্বের সকল মানবজাতিকে সে পথ দেখিয়ে গিয়েছেন। বিশ্বনবী (সঃ)-এর তিরোধানের পর নবুয়তের সমাপ্তি ঘটে এবং বেলায়ত যুগের সূচনা হয়। দ্বীন ও দুনিয়া উভয় জাহানের কর্মকান্ডে খোলাফায়ে রাশেদীনের অনুসরণের জন্য তখনকার মুসলমানগণ চার খলিফার হাতে বায়াত গ্রহণ করেছিলেন। খোলাফায়ে রাশেদীনের পরবর্তী যুগে শাসনতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান ও আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব আলাদা হয়ে যায়। রাষ্ট্রীয় কার্যাদির ব্যাপারে আনুগত্য প্রকাশের পদ্ধতি প্রচলিত হয়ে যায়। বলা বাহুল্য, এ ধর্মীয় ইমামগণই হচ্ছেন আল্লাহর ওলীগণ। আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় কর্মকান্ডের নেতৃত্ব দানকারীওলীগণ হচ্ছেন আল্লাহ ও রসূল (সঃ)-এ সকল প্রকা রহস্যজ্ঞানের ধারক ও বাহক। আল্লাহর ওলীদের দ্বারা কেয়ামত পর্যন্ত দুনিয়ার বুকে আধ্যাত্মিক জগতের নেতৃত্ব দিয়ে যাবার বিষটি কুরআন ও সুন্নাহর মাধ্যমে হযরত রসূল করিম (সঃ) প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। মহান আল্লাহ বলেন,
“জেনে রাখ! আল্লাহর ওলীদের কোন ভয় নাই এবং তাঁরা দুঃখিতও হবেন না (যাঁরা আল্লাহর ওলী) তাঁরা আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থাশীল এবং খোদা ভীরু। তাঁদের জন্য আছে সুসংবাদ পার্থিব জীবনে ও পরকালে, আল্লাহর বাণীর কোন পরিবর্তন নেই, উহা মহা সাফল্য”।
মহান আল্লাহ আরও বলেনঃ
“এবং যারা আল্লাহর পথে গমন করেছে এবং পরে নিহত হয়েছে অথবা (স্বাভাবিক) মৃত্যুবরণ করেছে তাদেরকে আল্লাহতালা অবশ্যই উৎকৃষ্ট জীবিকা দান করবে এবং তিনিইতো (আল্লাহতালা) সর্বোৎকৃষ্ট জীবিকা দাতা। তিনি তাদেরকে (পরকালে) অবশ্যই এমন জায়গায় স্থান দেবেন যা তাঁরা পছন্দ করবে এবং আল্লাহতো সম্যক প্রজ্ঞাময়, পরম সহনশীল”। (সুরা হাজ্জ্ব, আয়াত: ৫৮-৫৯) ।
এ বিশ্ব শাসন ব্যবস্থায় ওলীদের একটি বিরাট ভূমিকা রয়েছে। দুনিয়ার প্রশাসন চালাবার জন্য যেরূপ রাজা আছে, রাষ্ট্রপতি আছে, মন্ত্রীবর্গ আছে; তদ্রুপ এ বিশ্বের আধ্যাত্মিক কর্মকান্ড পরিচালনার জন্যও ওলীদের স্তর অনুযায়ী দায়িত্ব বন্টন করে দিয়েছেন মহান আল্লাহতালা। বিশ্বের শাসন ব্যবস্থা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, উহার গঠন প্রণালী অনেকটা ত্রিভূজ আকৃতির। অর্থাৎ নিচের দিকে বড় এবং উপরের দিকে ছোট। উহা নীচের দিকে হতে ছোট হয়ে উঠতে উঠতে উপরে দিয়ে একটি বিন্দুতে শেষ হয়। আবার উপর দিক হে নিচের দিকে যত যাওয়া যায় উহা তত বাড়তে থাকে। উদাহরণ স্বরূপ, রাষ্ট্রপতি, প্রধাণমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, সচিব ইত্যাদি স্তরে গিয়ে কর্মাচারীর সংখ্যা বিরাট আকার ধারণ করে। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রক্রিয়া নিচের দিক থেকে ক্রমশঃ উপরের দিকে যায় এবং বিভিন্ন স্তরে কিছু কিছু সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়ে যায়। কিন্তু এমন কতগুলো সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয় থাকে যেগুলো রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি ছাড়া সম্ভবপর হয় না। কিন্তু প্রশাসনিক কাঠামোর বাইরেও এমন কতগুলো শক্তি কাজ করে যা প্রশাসনিক কাঠামোর স্তরসমূহ ক্রমাগতভাবে অতিক্রম না করেও উপরের স্তরের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। উদাহরণ স্বরূপ, সংগঠিত দলের চাপ (Pressure Group), জনগণের আন্দোলন, শ্রমিক সংঘের আন্দোলন প্রভৃতি। এসব চাপের দ্বারা রাষ্ট্রপতি, প্রধাণমন্ত্রী কিংবা মন্ত্রীগণ অনেক সয় চাপ বা আন্দোলনের অনকূলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে বাধ্য হন। আবার অনেক সময় নিম্নশ্রেণীর কর্মচারীর সঙ্গে উচ্চপদস্থ কর্মচারীর একত্রে বসে চা, কফি কিংবা অন্যান্য পানীয় পান করার ফলে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে এবং এরূপ ব্যক্তিগত সম্পর্কও উচ্চপদস্থ কর্মচারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রভাবিত করতে পারে। এরূপ চাপ ও প্রভাব অনুভব করা যায় বটে, তবে দেখা যায় না যেহেতু ইহা নিয়মিত স্তর অতিক্রম করতে পারে না।
উপরে বর্ণিত পার্থিব প্রশাসন যন্ত্রের মত আধ্যাত্মিক জগতেও একটি প্রশাসন যন্ত্র আছে বলে কোন কোন সুফী সাধক অভিমত ব্যক্ত করেছেন। এদের মধ্যে মুহীউদ্দিন ইবনুল আরবী (রঃ)-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। হযরত রসূলে করিম (সঃ)-এর হাদীস শরীফেও এ সম্পর্কে সমর্থন পাওয়া যায়। অবশ্য আধ্যাত্মিক ভাবে বিশ্ব প্রশাসনের প্রকৃতি একটু ভিন্ন। সমস্ত বিশ্বব্রহ্মান্ডের মালিক হচ্ছেন মহান আল্লাহতালা। তিনি সমস্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের মালিক। মহান আল্লাহ বলেন,
“আকাশ ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্ব আল্লাহরই। আল্লাহ সর্ব বিষয়ে শক্তিমান”। (সুরা মায়েদা, আয়াত:৪৩) ।
মহান আল্লাহ বলেন,
“কর্ম বিধায়ক হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট”। (সুরা নেছা, আয়াত:১৩২) ।
সমস্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের মালিক আল্লাহ হলেও তিনি মকবুল বান্দাদের প্রার্থনা মঞ্জুর করে থাকেন। যাঁরা আল্লাহর ওলী অর্থাৎ যাঁরা আল্লাগর নৈতট্য লাভ করেছেন তাঁরা আল্লাহতালার কাছে আধ্যত্মিকভাবে বিশ্ব শাসনের জন্য আরজি পেশ করতে পারেন। এরূপ ক্ষমতাসম্পন্ন ওলীদের মধ্যে কাউকে চেনা যায়, আবার অনেককে চেনা যায় না। ওলীদের আরজী বা প্রার্থনার ক্ষমতা অসীম, যেহেতু মহান আল্লাহতালা প্রার্থনা ভালবাসেন। তাই ওলীদের প্রার্থনা যে খোদার দরবারে গৃহীত হবে এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। ওলীগণ আল্লাহতালাকে ধরে বিশ্বশাসনের ব্যাপারে এমন সব সিদ্ধান্ত নিয়ে আসতে পারেন যা মানুষের কল্পনার উর্ধ্বে। গাউছুল আজম হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রঃ), হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (রঃ), হযরত শাহজালাল (রঃ), হযরত গাউছুল আজম শাহ সুফী সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী (রঃ), বাবাভান্ডারী হযরত গোলামুর রহমান মাইজভান্ডারী (রঃ), মুর্শিদে কামেল হযরত দেলাওর হোসাইন মাইজভান্ডারী (রঃ), শাহানশাহ হযরত জিয়াউল হক মাইজভান্ডারী (রঃ) প্রমুখ ওলিবুজুর্গদের কেরামতসমূহ পর্যালোচনা করলে এটার সত্যতা অনুধাবন করা যায়। মওলানা জালালুদ্দিন রুমী (রঃ) বলেন, “ওলিগণ আল্লাহর নিকট হতে এমন ক্ষমতা লাভ করেন যে তাঁরা নিক্ষিপ্ত তীরকে মাঝপথে থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন”। হযরত সোরায়হ ইবনে ওবায়দ (রঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত আলী (রাঃ) বলেছেন,
“আমি হযরত রসূর (সঃ)-কে বলতে শুনেছি এ আবদাল নামক ওল –আল্লাহ শাহ দেশে হয়। তাঁরা চল্লিশ জন পুরুষ। তাঁদের মধ্য হতে কোহ পরলোকগমন করলে তাঁর স্থানে অন্যএকজনকে নিয়োগ করেন। তাঁদের ওছিলায় বৃষ্টিপাত হয়, শত্রুদের উপর বিজয় দান করা হয়। তাঁদের ওছিলায় শাম দেশের অধিবাসীরা আল্লাহর গজব থেকে পরিত্রাণ পায়”।
হযরত মালিক বিন আনাস (রঃ) বর্ণনা করেন যে,
“হযরত রসূলে করিম (সঃ) ফরমায়েছেন যে, আমাদের জন্য ৪০ জন ওলী আছেন। এঁদের মধ্যে ১২ জন সিরিয়ায় এবং ১৮ জন ইরাকে রয়েছেন”।
উল্লেখিত হযরত সোরায়হ ইবনে ওবায়দ (রঃ) হতে বর্ণিত হাদীসটির ব্যাখ্যায় মোল্লা আলীকারী রচিত মিরকাত স্মরণে মিশকাতুল মছাবীহ গ্রন্থে বর্ণিত হাদীসের অংশ প্রণিধানযোগ্য। ইবনে আসাকের (রঃ) হযরত আবদুল্লা ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে মারফু হাদীসটি বর্ণনা করেন। হাদীসের মর্মমতে, “নিশ্চয়ই আল্লাহতালা তিনশত জন ওলি আল্লাহ হযরত আদম (আঃ)-এর কলবের ন্যায়, চল্লিশ জন মুসা (আঃ)-এর কলবের ন্যায়, সাতজন ওলী ঈসা (আঃ)-এর কলবের ন্যায়, পাঁচজন ওলী জিব্রাইল (আঃ)-এর কলবের ন্যায়, তিনজন ওলী মিকাইল (আঃ)-এর কলবের ন্যায় এবং একজন ওলী ইস্রাফীল (আঃ)-এর কলবের ন্যায় সৃষ্টি করেছেন। যখন তাদের মধ্যে একজন পরলোক গমন করেন, তখন তাদের তিনজনের দলের একজন তাঁর স্থানে, পাঁচজনের দলেন একজন তিনজনের দলে, সাতজনের দলের একজন পাঁচজনের দলে, চল্লিশ জনের দলের একজন সাতজনের দলে এবং তিনশত জনের দলের একজন চল্লিশজনের দলে এবং কোন একজন সৎকর্ম পরায়ন মুসলমানকে সেই তিনশত দলের মনোনয়ন দান করে তাঁদের সংখ্যা পরিপূর্ণ রাখা হয়”। তাঁদের ওছিলায় রাসূল করিম (সঃ)-এর উম্মতদেরকে আল্লাহতালা বিপদ আপদ থেকে রক্ষা করেন। “ইহুদী ও খৃষ্টানদের ধর্মগ্রন্থেও ওলীদের প্রশাসনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এদের ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী ধার্মিক লোক হচ্ছে এ পৃথিবীর ভিত্তি। ধার্মিক লোক না থাকলে পৃথিবীর কল্যাণ লোপ পাবে। পৃথিবীতে কমপক্ষে ত্রিশজন ধার্মিক লোক আছেন, তাঁরা না থাকলে এ পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। এ সকল ধর্মগ্রন্থের কোন সংস্করণে দেখায় যায় যে, পৃথিবীতে ৪৫ জন ধার্মিক লোক আছেন যাঁরা এ পৃথিবীকে টিকে থাকতে সাহায্য করেন। এঁদের মধ্যে বেবিলোনে রয়েছেন ত্রিশজন, প্যালেষ্টাইনে ১৫ জন। পরবর্তীতে এ সকল ধর্মের বিশেষজ্ঞগণ এসকল ধার্মিক ব্যক্তির সংখ্যা ৩৬ জন বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন। এ সকল ধর্মীয় পন্ডিতগণ মনে করেন যে, এ সকল ধার্মিক লোক না থাকলে পৃথিবী থাকবে না এবং এঁদের কেউ মৃত্যু বরণ করলে তাঁর জায়গায় অন্যজন চলে আসবেন। (আদি পুস্তক:৯; Old Testament (Midas Version)। জুন্নুন মিশরী (রঃ)-এর মতে, পৃথিবীতে ৩০০ জন ওলী আছেন। এঁদের মধ্যে একজন হচ্ছেন গাউছ বা মূল খুঁটি। তাঁকে একটি বৃত্তের কেন্দ্র বিন্দুর সঙ্গে তুলনা করা যায়। তিনিই আকর্ষণ ও বিকর্ষণের কেন্দ্র। হাকিম তিরমিজি বর্ণনা করেছেন যে, হযরত রাসূলে করিম (সঃ) মানুষের মধ্যে ৪০ জন সিদ্দিক রেখে যান যাঁরা এ পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রাখেন। এদের একজনের মৃত্যু হলে আর একজন তাঁর জায়গায় আসেন। এঁদের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে আল্লাহতালা মোহর দিয়ে একজন ওলীকে পাঠিয়ে দেন। কিতাবে খতম-আল আউলিয়া (হাকিম তিরমিজি, ৮৯৮ খৃঃ) কাসফ আল মাহজুব (আল-হুজবেরী, ১০৬৩ খৃঃ)।
হযরত মুহীউদ্দিন ইবনুল আরবী (রঃ) বলেন,
“হযরত রাসূলে করিম (সঃ)-এর প্রতিনিধি ছাড়া এ পৃথিবীর অস্তিত্ব থাকতে পারে না। প্রতিনিধিদের মধ্যে একজন থাকেন যাঁকে কুতুব বা খুঁটি বলা যায়। কোন এক যুগে এবং কোন এক নির্দিষ্ট স্থানে তাঁর জন্ম হয়। তাঁর মধ্যে আধ্যাত্মিক গুণাবলীর পরিপূর্ণতা থাকে এবং তাঁকে সাধারণত ছাহেবে জমান বলা হয়”।
গাউছ কিংবা কুতুবকে অনেক সময় মানুষ চিনতে পারে না। তবে কোন কোন ক্ষেত্রে এ শ্রেণীর ওলীদের মধ্যে জাগতিক ও আধ্যাত্মিক গুণাবলীর সমন্বয় ঘটে। এ শ্রেণীর ওলীদের মধ্যে হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত ওমর (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ) অন্তর্ভূক্ত। হযরত মুহীউদ্দিন আরবী (রঃ)-এর মতে, “গাউছ হলেন বিশ্বব্রহ্মান্ডের প্রাণকেন্দ্র। তাঁর নিকট থেকে চতুর্দিকে আলো বিচ্ছুরিত হয়ে সমস্ত জীবের প্রাণে প্রবেশ করে। গাউছকে দু’জন ইমাম প্রতিনিয়ত সাহায্য করেন। গাউছের পরে হলেন চারজন আউতাদ বা স্তম্ভ। আউতাদের অধীনে আছেন সাতজন আবদাল। এঁদের কাজ হলো আবহাওয়া নিয়ন্ত্রন করা। এঁদের পরে রয়েছেন বারজন নুকাবা বা মনোনত পরহেজগার ব্যক্তি। এসকল নুকাবাগণ মানুষের অন্তর্নিহিত চিন্তসমূহ সম্পর্কে উপলব্ধি করতে পারেন। এদের পরে আরও আটজন নুকাপ আছেন যাঁদের মধ্যে মহান আল্লাহতালা আট রকমের গুণ দিয়েছেন। সবার শেষে আছেন হুয়ারী বা শিষ্যগণ এবং তাঁদের পশ্চাতে রয়েছেন আরও ৪০ জন লোক”। হযরত মুহীউদ্দিন ইবনুল আরবী (রঃ)-এর মতে,
“পয়গম্বারদের মধ্যে যেমন শেষ পয়গাম্বর আছেন, ওলীদের মধ্যেও তেমনি শেষ ওলী রয়েছেন যার কাছে সীলমোহর রয়েছে”।
তাঁর মতে “দুটি সীল মোহর রয়েছে- একটি হযরত ঈসা (আঃ)-এর সঙ্গে এবং অপরটি সর্বশ্রেষ্ঠ ওলীর সঙ্গে”। প্রখ্যাত সুফী আশ শাধিলী বলেন, “প্রত্যেক পীর হলে নিন নিজ ত্বরিকার কুতুব, খুঁটি বা গাউছ হলেন একজন”। (Alnafakhir al-Aliya Fi-Alma-Atnir-Osh-Shadhiliya by Ahmad-Ibu-Ayas) । পল বি, ফেন্টনের মতে, “বহু সুফী সাধক তাঁদের পীরকে গাউছুল আযম বা মূল খুঁটি বলে দাবী করেছেন। যেহেতু অনেক সময় গাউছুল আযম দৃশ্যমান নহেন। এ অবস্থায় একটি সময়গত মূল খুঁটি (কুতুবুজজ্বমান) ধারণার সৃষ্টি হয়েছে”। (Journal of the Muhiddin-Ibu-Arabi Society, Vol.X,1991, Oxford University Press Ltd.) । এ বাণীটি বিশ্লেষন করলে দেখা যায় যে, একজন ওলী কোন নির্দিষ্ট যুগের বা সময়ে জন্য শেষ ওলী হতে পারেন। কিন্তু সমস্ত যুগ বা আবহমান কালের জন্য নহেন। কুতুব বা গাউছুল আযম যিনিই হউন না কেন বেলায়তের দরজা বন্ধ নয়, যেহেতু আধ্যাত্মিক উন্নতি বা উৎকর্ষের কোন সীমা পরিসীমা নেই।
নবীদের ন্যায় ওলীদের দু’টো দিক রয়েছে: একটি হল জাহেরী বা ‘ব্যক্ত’ দিক এবং অপরটি হল বাতেনী বা ‘অব্যক্ত’ দিক। বাতেনী শক্তি দিয়ে তাঁরা দিলের খবর বলতে পারেন। মওলানা রুমীর ভাষায়, “নগর পাল হলে শরীরের বাদশাহ, আর ওলী হলেন দীলের বাদশাহ। মানুষের বাহ্যিক আচার আচরণের ব্যাপারে তিনি (নগর পাল) মানুষের উপর প্রয়োজনে আইন প্রয়োগ করতে পারেন। কিন্তু মানুষের দীলের উপর তাঁর কোন ক্ষমতা চলে না। ওলী মানুষের দীলের সাথে সংযোগ রক্ষা করতে সমর্থ এবং দীলের মঙ্গল সাধন করার ক্ষমতা রাখেন”। একদা হযরত ওমর (রাঃ) মদীনার এক মসজিতে খোৎবা পাঠ করছিলেন, এমন সময় তিনি হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন, “শারিয়া! জবল, জবল”। অর্থাৎ “শারিয়া! পাহাড়, পাহাড়”। তখন ইরাকে কাফেরদের সাথে মুসলমানদের যুদ্ধ চলছিল। শরিয়া ছিলেন মুসলিম সৈন্যদের সেনাপতি। হযরত ওমর (রাঃ) মদীনয় থেকে ইরাকে যুদ্ধরত শারিয়াকে পাহাড়ের দিকে নজর দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাঁর নির্দেশ শারিয়া শুনেছিলেন এবং তাঁর নির্দেশমত কাজ করেছিলেন। এটা হচ্ছে ওলীদের বাতেনী রূপ। এটা মানুষ দেখতে পায় না। বদরের যুদ্ধে শত্রুদের লক্ষ্য করে হযরত রাসূল করিম (সঃ) কাঁকড় নিক্ষেপ করেছিলেন। এ যুদ্ধে কাফেররা পরাজয় বরণ করেছিল। মহান আল্লাহ এ প্রসঙ্গে বলেন,
“তোমরা তাদের বদ করনি, আল্লাহ তাদের বধ করেছিলেন; আর যখন তুমি কাঁকড় ছুঁড়েছিলে তখন তুমি [হযরত রাসূলে করিম (সঃ)] কাঁকড় ছুঁড়নি, আল্লহই ছুঁড়েছিলেন”। (সূরা আনফাল, আয়াত ১৭) ।
কাফেরদের হযরত রাসূল করিম (সঃ)-এর কাঁকড় নিক্ষেপ করা এবং উহা শত্রুদের পরাজিত হওয়ার কারণ হওয়ার বিষয়টি হযরত রাসূলে করিম (সঃ)-এর বাতেনী দিক যা সাধারণ লোকের বোধগম্য নয়। হযরত বড় পীর (রঃ) রমজান মাসে মায়ের কোলে থাকার সময় দুধ না খাওয়া, ইফতারের সময় দুধ খাওয়া, মায়ের উদরে থাকাকালীন কোরআন শরীফের পনেরো পারা মুখস্ত করা, ক্রমাগত চল্লিশ দিন আল্লাহর উপর নির্ভর করে কোন কিছু না খেয়ে বেঁচে থাকা, কোন প্রকার যন্ত্রের সাতয্য ছাড়া হাজার হাজার লোকের সমাবেশে তাঁর বক্তৃতা শোনা, আজমীর শরীফের খাজা বাবা (রঃ)-এর ঘটিতে আনার সাগরের সমস্ত পানি নিয়ে আসা, হযরত গাউছুল আযম মাইজভান্ডারী (রঃ)-এর ৪২ মাইল দূরে রাঙ্গুনিয়ার কোদালা পাহাড়ের গভীর অরণ্যে বাঘের মুখে বদনা নিক্ষেপের দ্বারা ভক্তের জীবন বাঁচানো, হযরত বাবা ভান্ডারী সৈয়দ গোলামুর রহমান মাইজভান্ডারী (রঃ) ও শাহানশাহ হযরত জিয়াউল হক মাইজভান্ডারী (রঃ)-কে বাঘ কর্তৃক পাহারা দেয়া প্রভৃতি ওলীদের বাতেনী ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ মাত্র। অন্যদিকে ওলীদের স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি প্রভৃতি হচ্ছে তাঁদের জাহেরী রূপ। এ বাতেনী ক্ষমাতার বলেই বাতাস বাদশাহ সোলেমানের বাহক বনে গিয়েছিল, সাগর হযরত মূসা (আঃ)-এর কথা শুনেছিল, চন্দ হযরত রাসূলে করিম (সঃ)-এর ইশারা বুঝতে পেরেছিল, হযরত ইব্রহিম (আঃ)-এর জন্য আগুন ফুলে পরিণত হয়েছিল, পাথর হযরত রাসূলে করিম (সঃ)-কে সালাম জানিয়েছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে যাঁরা আল্লাহর ধ্যান করেন, যাঁরা আল্লাহর ওলী তাঁদের সঙ্গে পাথরও আত্মীয়ের মত কথা বলে। তাঁরা পাথরের নিকট গেলে পাথরেও প্রাণ সঞ্চারিত হয়। তাই মওলানা রুমী (রঃ) বলেন,
“আল্লাহ ওলীর সাথে এক মুহূর্তের সাহচর্য লাভ করা শত বৎসরের এবাদতের চাইতে উত্তম”।
তিনি আরও বলেছেন,
“যারা ওলী আল্লাহর সান্নিধ্য থেকে দূরে থাকবে তারা খোদার রহমত লাভের পথ থেকে দূরে সরে পড়বে”।
উল্লেখ্য যে, যাঁরা আল্লাহর অনুগ্রহ লাভের জন্য তাঁদের জীবন মানবের কল্যাণার্থে উৎসর্গ করে গেছেন, তাঁরা সর্বকালের জন্য আদর্শ মহাপুরুষ হিসেবে অমর হয়ে আছেন। এ সকল ওলী-আল্লাহগণের সাথে তাঁদের ভক্ত অনুরক্তদের রূহানী সম্পর্ক বজায় থাকে। ভক্ত-অনুরক্তদের আকুতি-মিনতি তাঁরা শুনতে পান। ভক্ত-অনুরক্তদের সকল সমস্যার সমাধানের জন্য মহান আল্লাহতালার নিকট তাঁরা আরজি পেশ করেন এবং সিদ্ধান্ত নিয়ে আসেন। প্রকৃতপক্ষে ওলী হচ্ছেন ঐ ব্যক্তি যিনি নিজের অর্থাৎ নিজের অস্তিত্বকে ধ্বংস (ফানা) করে দেন। তিনি আল্লাহর সত্ত্বার সাথে একাত্মতা লাভ করেন। কখনও বিলুপ্ত হন না। পবিত্র কোরআন মজীদে মহান আল্লাহ বলেন, “ফালানাহ্ ইয়ান্নাহু হায়াতান তাইয়েবাতান” অর্থাৎ তাঁকে পবিত্র হায়াত (জীবন) দেব মৃত্যু থেকে। সত্যিকার ওলীগণ হচ্ছেন বিশ্বের হৃদয় ও প্রাণস্বরূপ এবং সমগ্র বিশ্ব হচ্ছে তাঁদের দেহ ও আবরণ স্বরূপ। আগুনের স্ফুলিঙ্গের ক্ষেত্র যেমন লোহা, অনুরূপ খোদার তজল্লীর ক্ষেত্র হল বিশ্বের হৃদয়রূপ গাউছে জমান বা যুগের ওলী। তাইতো হযরত মনছুর হাল্লাজ (রঃ)-এর রক্ত মোবারকও বলেছিল, “আনাল হক” অর্থাৎ “আমিই সত্য”। কবি তাই যথার্থই বলেছেন,
“বিদ্যা, বুদ্ধি, শক্তির জোরে,
কে তোরে চিনিতে পারে,
পর্দার আড়ালে তুমি রহিয়াছ ফাঁকে
যে হয়েছে তোর পিয়ারা,
দেখে তোরে জগৎ জোড়া,
লাইছা কামিছলিহী সাইয়ান জবানে ফুঁকে”।
উপরোক্ত সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে এটা নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয় যে, একজন মহান ওলীর ইহকাল ও পরকালে প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা অসাধারণ। এরূপ মহান ওলীর সান্নিধ্য যাঁরা পেয়েছেন তাঁরা সত্যি ভাগ্যবান। ওলীর সান্নিধ্য পেতে হলে দীল পরিস্কার ও পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে, আল্লাহ ও রাসূল (সঃ) ও ওলীর জন্য আন্তরিক ভক্তি ও শ্রদ্ধা রাখতে হবে এবং খোদায়ী প্রেম ও ভক্তির রসে হৃদয়কে সিক্ত করতে হবে। আল্লাহ, রাসূল (সঃ) এবং ওলীর প্রতি প্রেম ও ভক্তি না থাকলে ঈমান হবে দুর্বল, নামাজ হবে ব্যায়াম, রোজা হবে নিছক উপবাস, হজ্জ্ব হবে নিছক বিদেশ ভ্রমণ, জাকাত হবে দম্ভের নিশান এবং বিদ্যা হবে অসার। সুতরাং স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন হৃদয় নিয়ে আমাদেরকে সত্যিকার ওলীর সান্নিধ্য লাভের চেষ্টা করতে হবে এবং প্রেম ও ভক্তির সাথে ওলী-বুজুর্গণের খেদমত ও ছোহবতে থেকে রাসূল (সঃ)-এর সাফায়াত নসীব হবার জন্য ও খোদার সন্তুষ্টি লাভের নিমিত্তে চেষ্টা চালাতে হবে। তবেই আমাদের পার্থিব ও পরকালীন জীবন সার্থক ও সুন্দর হবে। অন্যথায় আমরা কূলহীন সাগরে শেওলার মত ভাসতে থাকবো শুধু, গন্তব্যস্থলে কোনদিন পৌছুতে পারব না। খোদা আমাদের সকলকে গন্তব্যস্থলে পৌছার অর্থাৎ খোদার দিদার লাভ করার তওফিক দিন। আমিন।




0 Comments: