এক সওদাগরের খাঁচায় বন্ধী একটি অতি আদুরে তোতা পাখি ছিল। সে পাখিটিকে অতি যত্নে পুষছিল। দৃশ্যত যদিও পাখিটির কোন কষ্ট ছিলনা। কিন্তু বন্ধী অবস্থায় নিদারুণ মর্মযাতনা ভোগ করতে ছিল। সে তার অন্য সংগীদের সাথে মুক্ত আকাশে উড়ে বেড়ানোর আকাংখা পোষণ করত। একদিন সওদাগরের ইচ্ছা হল ভারত সফর করবে। যাত্রা সময় উদারতা বশে তোতাকে প্রশ্ন করল, তোমার জন্য কি নিয়ে আসব? তোতা বলল, আমি পাখি আমার আবার কি চাহিদা থাকতে পারে? তবে একটা অনুরোধ, ভারতবর্ষে আমাদের জাতীয় পাখি অনেক আছে। তাদের কোন দলের সাথে যদি দেখা হয় বলবেন, আল্লাহর ইচ্ছায় একটি তোতা আমার নিকট বন্দী আছি। সে তোমাদের প্রতি বড় অনুরাগী। তোমাদের সে সালাম জানিয়েছে আর ইনসাফ চেয়েছে। তোমাদের নিকট উপায় ও উপদেশ চেয়েছে। বলা বাহুল্য, কিসের উপায় বা কি উপদেশ তা সওদাগরের নিকট পাখি বলেনি। আসলে পাখি বলেছিল, এটি কি ন্যায় সংগত যে, এখানে এই পিঞ্জরের মধ্যে আবদ্ধ থেকে আমি প্রেমের দহন সহ্য করব এবং বিরহ যাতনায় মারা যাব? আর তোমরা মনের আনন্দে বৃক্ষ ডালে উড়ে বেড়াবে? বন্ধুগন এটা কি বন্ধুত্বের পরিচয়?





  • বন্ধগন! কোন এক সু্প্রভাতে বাগবাগিচার আনন্দগন পরিবেশে এই জনম দুঃখীকে একটিবার স্মরণ করো। আর একটু খানিক উপায় বলে দিবে যে, কিভাবে আমি এই পিঞ্জর হতে মুক্তি পেতে পারি?
    -বন্ধুগন! প্রিয়তমের সানিধ্যে থেকে তোমরা মদিরার পেয়ালা পান করতেছ আর আমি পিঞ্জরে আবদ্ধ থেকে শোনিতের পেয়ালা পান করতেছি। আমার প্রতি যদি তোমাদের সদয় ব্যবহার ইচ্ছা থাকে তবে আমাকে স্মরণ করে প্রিয়তমের সামনে আমার নামে এক পেয়ালা মদিরা পান করো। অথবা আমাকে বিপদগ্রস্থ মনে করে এক ঢোক মদিরা মাটিতে ফেলে দাও।
    কিন্তু সওদাগর পাখির মনের এই অব্যক্ত কান্না বুঝতে পারেনি। যাহোক সওদাগর ভারতে পৌছে তার বানিজ্যকর্ম শেষ করে এক বৃক্ষের নিজ দিয়ে যাচ্ছিল। ঐ গাছে অনেক গুলো তোতা মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। সওদাগর গাছে তোতা পাখির দল দেখে তার পোষা তোতার ইচ্ছার কথা মনে পড়ল। সে পাখিদের উদ্দেশে বলল, শোন হে তোতা গন আল্লাহর ইচ্ছায় একটি তোতা আমার নিকট পিঞ্জিরা বদ্ধ আছে। আর সে তোমাদের সালাম জানিয়ে তোমদের নিকট উপদেশ চেয়েছে। বল, তোমরা তাকে কি উপদেশ দিবে? সওদাগরের কথা শুনে তোতাগন ক্ষনিক নীরব থাকল। অতঃপর তাদের মধ্য হতে একটি তোতা হঠাৎ ছটফট করতে করতে মাটিতে পরে গেল। মনে হল যেন সে মরে গেছে। পাখিটির মৃত্যুতে সওদাগরের ভারি দুঃখ হল। দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে সে বাড়িতে ফিরে এল। যথাসময়ে তোতাটি বলল, বলুন আমার কথা কি আমার জাতীয় ভাইদের বলেছিলেন কিনা? সওদাগর বলল, বলেছিলাম তবে না বলাই ভাল ছিল। তোমার সকরুন অবস্থার কথা শুনে একটি তোতা ছটফট করতে করতে সেখানেই মারা গিয়েছে। যেই না বলা অমনি পিঞ্জিরাবদ্ধ তোতাটি কাটা কবুতরের মত ছটফট করতে করতে মুহুর্তেই মারা গেল। প্রকৃতপক্ষে তোতাটি মরেনি। মরার অভিনয় করে পরে ছিল। কিন্তু সওদাগর তা বুঝেনি। তোতাকে মৃত ভেবে সে খাঁচা থেকে বাইরে এনে দুরে নিক্ষেপ করল। সংগে সংগে তোতাটি উড়ে গিয়ে গাছের ডালে বসল। অবাক সওদাগর ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে রইল।
    মুক্তি প্রাপ্ত তোতা সওদাগরকে বলল,শুনুন সওদাগর আমার কর্যক্রমে আপনি বিস্মিত হয়েছেন কিংবা আমাকে প্রতারক মনে করছেন। কিন্তু এই কর্যক্রমই আমাকে আপনার লোহ পিঞ্জর থেকে মুক্তি দিয়েছে। আপনি আমাকে ভারতীয় তোতার উপদেশ শুনিয়েছিলেন। ভারতীয় তোতাটি আসলে মারা যায়নি। সে তার কর্যক্রমের দ্বারা আমাকে এই উপদেশ দিয়েছিল যে, পিঞ্জর থেকে মুক্তি পেতে হলে তুমাকে কথাবলা বন্ধ করতে হবে। এবং মৃত্যুর পুর্বে তোমাকে মরতে হবে তবেই তুমি মুক্তি পাবে। ভারতীয় তোতার উপদেশে আমি কথা বন্ধ করে মৃতের ন্যায় পড়ে রয়েছিলাম। তাই আজ আমি মুক্তি পেয়েছি। "সুন্দর কথা সুখ্যাতি ছড়ায় আর সুখ্যাতি মানুষকে দুনিয়ার খাঁচায় আবদ্ধ করে রাখে। "
    চলবে……….
    "দিওয়ানে শামসে তাবরিজ"

0 Comments: