বিদায় কালে তোতার উপদেশ-
বিদায় কালে তুতা সওদাগর কে বলল, বিদায় হে মনিব। আপনি আমার প্রতি দয়া করেছেন, আমাকে বন্দিত্বের অন্ধকার হতে মুক্তি দিয়েছেন। বিদায় হে মনিব! নিজ দেশে ফিরে চললাম, মনে রাখবেন মৃত্যুর আগেই যদি মৃতের ন্যায় হতে পারেন তাহলে একদিন আমার মত আপনিও মুক্তি লাভ করতে পারবেন। সওদাগর বলল, ফি আমানিল্লাহ, তুমি দেশে চলে যাও। সত্যিই আজ তুমি আমাকে এক নতুন পথ দেখিয়েছো।মৃতের ন্যায় না হতে পারলে দুনিয়ার জাল হতে মুক্তি পাওয়ার ভিন্ন কোনো উপায় নেই। তোতা পাখির বিদায় গ্রহণের পর সওদাগর নিভৃতে মনে মনে চিন্তা করতে লাগলো,শিক্ষা গ্রহণের জন্য এই ঘটনায় আমার জন্য যথেষ্ট। আজ হতে আমি সেই চেষ্টাই করবো যাতে দুনিয়ার মানুষ আমাকে মৃত মনে করে দূরে সরিয়ে দেয়।এবং পার্থিব সুযশ সুখখ্যাতি ও প্রভাব-প্রতিপত্তির বেড়াজাল হতে মুক্ত হয়ে পরম প্রভুর সান্নিধ্যে গমন করতে পারি। হাদীস শরীফে আছে, সদা নিজেকে কবরবাসীদের মধ্যে গণ্য করো। মৃত ব্যাক্তির কামনা বাসনা বলতে কিছু থাকে না। কাম ক্রোধ লোভ মোহ মাৎসর্য ইত্যাকার রিপু গুলো তার মধ্য হতে সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে যায়। সজীব সচেতন মানুষ যদি তদ্রুপ আল্লাহর তাবেদারী ও আনুগত্যের পথে সর্বপ্রকার কামনা-বাসনা পরিত্যাগ করে তাহলে আখিরাতে তার মুক্তির পথ একেবারে সহজ হয়ে যায়। সুমধুর কন্ঠস্বর সওদাগর কে আকৃষ্ট করেছিল তোতার দিকে।তোতার পিঞ্জরাবদ্ধ হওয়ার এটাই ছিল একমাত্র কারণ। মানুষ যখন অনুরূপভাবে নিজের কোন গুন প্রকাশ করে তখন মানব সমাজ তার দিকে আকৃষ্ট হয় এবং চতুর্দিকে তার সুনাম সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। এতে তার দুই প্রকার ক্ষতি হয়। এক প্রকার ক্ষতি পার্থিব অন্য প্রকার ক্ষতি পারোলৌকিক। পার্থিব ক্ষতি এই যে, সুযশ বৃদ্ধির কারণে তার নিকট লোকের গমনাগমন বেড়ে যায় এবং তার ফলে তাকে অনেক মূল্যবান সময় নষ্ট করতে হয়। অপরপক্ষে সুনাম মারাত্মক রোগ। মানবাত্তার আল্লাহমুখী উন্নতির পথে এরোগ কত যে কঠিন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে তা ভুক্তভোগীরাই ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারে। প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধির ফলে চাটুকারদের ভিড় জমে। চাটুকার গন বিভিন্ন কায়দায় বিভিন্ন ভঙ্গিমায় তার প্রশংসা করতে থাকে। অহরহ এ ভাবে প্রশংসা বাণী শুনতে শুনতে যখন গর্ব রুপি শয়তান তার অন্তরে স্থায়ীভাবে বাসা বাঁধে তখন সে নিজের আয়ত্তের বাইরে চলে যায়। সে জানে না যে শয়তান এভাবে তার মত হাজার হাজার লোককে পানিতে ডুবিয়ে দিয়েছে।নমরুদ,হামান,ফেরাউন এবং এদের মতো আরো যে সব রাজা বাদশা ধ্বংস প্রাপ্ত হয়েছে তাদের ধ্বংসের মূলে ছিল চাটুকারদের প্রশংসা ও তার ফলে সৃষ্ট অহংকার। অহংকার এর জন্যই আজাজিলের হাজার হাজার বছরের ইবাদত নষ্ট হয়ে অবশেষে সে শয়তান আখ্যা পেয়েছে। "চাটুকারদের পিয় বাক্য ও চাটুবানী বেশ মজার খাদ্যই বটে। তবে তা কম খাও, কারণ এর পরিণাম হলো অগ্নি'গ্রাস। তার আগুন লুকায়িত কিন্তু স্বাধ প্রকাশ্য।শেষ পর্যন্ত তার ধঁয়া প্রকাশ পাবেই"। কোন লোক যখন কারো প্রশংসা করে তখন তার প্রশংসা বাণী শুনতে বেশ ভালো লাগে। কিন্তু এই প্রশংসার কারণে তার অন্তরে যে গর্ব সৃষ্টি হয় তখনকার মতো সে দেখতে না পেলেও পরবর্তীকালে তাই তাকে জাহান্নামের আগুনের দিকে টেনে নিয়ে যায়। বহু পীর মুর্শিদের দরবারে ও দেখা যায় চাটুকারদের প্রচুর ভিড়। তারা মুরিদ হয়েছে পীর-মুর্শিদ থেকে বিভিন্ন দুনিয়াবী ফায়দা হাসিল করার উদ্দেশ্যে। তারা পীর মুর্শিদের সামনে তার প্রচুর প্রশংসা করতে থাকে। বস্তুতঃ তারা মুনাফেক। এদের কারণে আজ অনেক পীর-মুর্শিদ গোমরা হয়ে যাচ্ছেন। পীর মুর্শিদ গোমরা হয়ে গেলে তাদের মুরিদ গন ও গোমরা হয়ে যাবেন। আর এটাই চিরন্তন সত্য। তাই যারা বিজ্ঞ পীর-মুর্শিদ, তারা কখনোই চাটুকারদের প্রশ্রয় দেন না। যারা দেন তারা ধ্বংসের অতল গহবরে হারিয়ে যান। এই চাটুকার সম্পর্কে সহি হাদিস শরীফে উল্লেখ আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যদি কোন ব্যক্তি তোমার সম্মুখে তোমার প্রশংসা করে তবে যেন সে তোমার শত্রু এবং তার মুখে কংকর নিক্ষেপ করো।
" দিওয়ানে শামসে তাবরিজ"




0 Comments: