শরীয়ত, তরিকত, হাকিকত, ও ইলমে মারেফত, এ সমস্ত কুরআন সুন্নাহ সম্মত কি না?

শরীয়ত, তরিকত, হাকিকত, ও ইলমে মারেফত, এ সমস্ত কুরআন সুন্নাহ সম্মত কি না?


শরীয়ত, তরিকত, হাকিকত, ও ইলমে মারেফত, এ সমস্ত কুরআন সুন্নাহ সম্মত কি না? এবং এ সমস্ত নিজ জীবনে প্রতিষ্ঠত করা যাবে কি না? বর্তমান আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন বক্তাগন ওয়াজ মাহফেলে বক্তব্য দিয়ে থাকেন যে শরীয়ত, তরীকত, হাকিকত ও মারেফত বলে কুরআন ও হাদিস শরীফে কোথাও কোন কিছু নেই। উক্ত বক্তারা বলে থাকেন যে ইসলাম ধর্মকে বিকৃত করার জন্য রাছুলুল্লাহ (ছাঃ) এর পথ ও মত ছেড়ে দিয়ে উক্ত পদ্ধতি ধরেছে এবং আরও তারা বলে থাকেন যে, পীর সাহেবদের কাছে মুরিদ বা বাইয়্যাত হওয়া নাজায়েজ।
উত্তরঃ
এ প্রসঙ্গে প্রথমে আমি মহান কুরআন পাকের পবিত্র আয়াত শরীফে উল্লখ্য করছি। আল্লাহ পাক বলেনঃ
লাকাদ মান্নাল্লাহু আলাল মোমিনীনা ইঁজ বা ' আছা ফীহিম রাছুলাম মিন আনফুছিহিম ইয়াতলু আলাইহিম আ-ইয়াতিহী ওয়া ইয়ূজাক্কিহিম অয়া ইয়ূ আল্লীমুহুমুল কিতাবা ওয়াল হিকমাহ অয়া ইন কানু মিন কাবলু লাফী দ্বালা-লিম মুবীন।
— সূরা আল এমরান, আয়াত ১৬৪
অর্থ্যাৎ মুমিনদের প্রতি আল্লাহ পাকের বড়ই ইহসান যে তাদের মধ্যে হতে তাদের জন্য একজন রসূল প্রেরন করেছেন, তিনি আল্লাহ পাকের আয়াতগুলি তিলায়াত করে শুনাবেন তাদেরকে তাজকিয়া (পরিশুদ্ধ) করবেন এবং কিতাব ও হিকমত (আধ্যাতিক) জ্ঞান শিক্ষা দিবেন। যদিও তারা পূর্বে হেদায়েত প্রাপ্ত ছিল না। অনুরূপ সুরা বাকারা ১২৯ ও ১৫১ নং আয়াত শরীফে উপরোক্ত আয়াত শরীফের সমর্থবোদক আয়াত শরীফে উল্লেখ আছে। মূলতঃ উল্লেখিত আয়াত শরীফে বিশেষভাবে চারটি বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে তন্মধ্যে আয়াত শরীফ তেলাওয়াত করে শুনানো এবং কেতাব ও হিকমত শিক্ষা দেয়া এ তিনটি বিষয় হচ্ছে এলমে জাহির বা ইলমে ফিকাহ এবং ইলমে মারেফতের অন্তর্ভূক্ত। যা এবাদাতে জাহের বা দ্বীনের যাবতীয় বাহ্যিক হুকুম আহকাম পালন করার জন্য ও দৈনন্দিক জীবন যাপনের জন্য হালাল কামাই করার জন্য প্রয়োজন। আর চতুর্থ হচ্ছে তাজকিয়ায়ে "ক্বলব" অর্থ্যাৎ অন্তর পরিশুদ্ধ করার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি লাভ করা। মুফাসসিরীনে কিরামগন "ইউযাক্কীহিম" এর ব্যাখ্যায় প্রসি্দ্ধ তাফসীরের কিতাব যেমন তাফসীরে জালালাইন, তাফসীরে কামালাইন, বায়হাকী, ইবনে কাছীর, রুহুল বয়ান, তাফসীরে মাজহারী, মারেফুল কোরআন সহ আরও অনেক তাফসীরে তাজকিয়ায়ে কলব বা অন্তকরন পরিশুদ্ধ করাকে ফরজ বলেছেন এবং তজ্জন্যে এলমে তাসাউফ অর্জন করাকে ফরজ বলেছেন। এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত মুফাসসিরে ফকিহুল উম্মত হযরত মাওলানা শায়েখ ছানাউল্লাহ পানি পথি (রহঃ) তাঁর বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ তাফসীরে মাজহারীতে উল্লেখ করেন যে সকল লোক ইলমে লা-দুন্নী বা ইলমে তাছাউফ হাছিল করে তাদেরকে সূফি বলে। তিনি ইলমে তাছাউফ অর্জন করা ফরজ আইন বলেছেন। কেননা ইলমে তাছাউফ মনকে বা অন্তর করনকে গায়রুল্লাহ হতে ফিরিয়ে আল্লাহ পাকের দিকে রুজু করে দেয়। সর্বদা আল্লাহ পাকের হুজুরী পয়দা করে দেয় এবং ক্বলব্ বা মন থেকে বদ খাছলত সমূহ দূর করে নেক খাছলত সমূহ পয়দা করে অন্তরটা পরিশুদ্ধ করে দেয়।
আত্মশুদ্ধি অর্জনের জন্য ইলমে তাসাউফ যে ফরজ এ প্রসঙ্গে খাতিমুল মুফাসসিরীন আল্লামা হযরত ইসমাইল হাক্কি (রহঃ) তাঁর তাফসীরে রুহুল বয়ানে উল্লেখ করেন যে, দ্বিতীয় প্রকার ইলেম হচ্ছে ইলমে তাছাউফ যা ক্বলব বা অন্তরের সাথে সংশ্লিষ্ট। এ ইলমে অর্জন করা প্রত্যেক মুমিনের জন্য ফরজ।
এলমে তাছাউফ অর্জন করা ফরজ হওয়া সম্পর্কে জামিউল উসুল নামক কেতাবে উল্লেখ আছে যে, এলমে তাছাউফ যা বদ খাছলত সমূহ হতে নাজাত বা মুক্তি পাওয়ার একমাত্র মাধ্যম। পক্ষান্তরে আল্লাহ প্রাপ্তি রিপু বিনাশ ও সংযম শিক্ষার একমাত্র পথ। এই জন্য ইলমে তাছাউফ শিক্ষা করা ফরজে আইন।
মূলতঃ শরীয়ত, তরীকত, হাকীকত ও মারেফত এ সব প্রত্যেকতটিই কোরআন সুন্নাহ সম্মত এবং তা মানা ও বিশ্বাস করে কায্যে পরিনত কোরআন সুন্নাহরই নির্দেশের অর্ন্তভূক্ত।
আল্লাহপাক তাঁর কালাম পাকে এরশাদ করেন
লি-কুল্লিন-জ্বায়াল না মিনকুম শির আতাউ ওয়া মিনহাজ।
অর্থ্যাৎ আমি তোমাদের প্রত্যেকের জন্য একটি জীবন বিধান বা শরীয়ত অপরটি তরীকত সম্পর্কিত বিশেষ পথ নির্ধারন করে দিয়েছি
— সূরা মায়ীদা, আয়াত ৪৮
আর হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে
শরীয়ত একটি বৃক্ষ স্বরূপ তরীকত তার শাখা প্রশাখা মারিফত তার পাতা এবং হাকিকত তার ফল
— সিসরুল আসরার
হাদীস শরীফে আরও এরশাদ হয়েছে
শরীয়ত হলো আমার কথা সমূহ (আদেশ নিষেধ), তরীকত হলো আমার কাজ সমূহ (আমল), হাকিকত হলো আমার গুপ্ত রহস্য।
উল্লেখ্য যে, উক্ত শিক্ষা বা এলমে তাছাউফ অর্জন করার ও এছলাহে নাফস বা আত্মশুদ্ধি লাভ করার একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে কোন কামিল মোকাম্মেল পীর সাহেবের নিকট বাইয়ত হওয়া যিনি ফয়েজ দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। এখন প্রশ্ন হলো এছলাহে নাফ্স বা আত্মশুদ্ধি লাভ করা ফরজ হয় আর তা লাভ করার মাধ্যমে বাইয়াত হয় তবে বাইয়াত হওয়া নাজায়েজ হয় কি করে?
তরীকত যথাযথ ভাবে পালন করতে হলে দ্বীনে এলেম অর্জন করতে হবে যা ফরজ। এ এলেম দু'প্রকার
ইলমে ফিকাহ
ইলমে তাছাউফ।
ইলমে ফিকাহ ইলমে ফিকাহ দ্বারা এবাদাত জাহিরা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ হয়।
ইলমে তাছাউফ যার দ্বারা ইলমে তাছাউফ যার দ্বারা এবাদাত বাতিনা বা আভ্যন্তরীন অবস্থা পরিশুদ্ধ হয়ে ইখলাছ অর্জিত হয়ে।
এ মর্মে হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে
আল এলমে এলমানে ইলমুল ফিল ক্বালবে ফাজাকাল ইলমুল নাফেউ ওয়া ইলমুল আলাল লেছান ফাজাকা হুজ্জাতুল্লাহে আলা এবনে আদামা"।
এলেম দু'প্রকার (১) ক্বালবী এলেম। এটা হলো উপকারী এলেম। (২) লিসানী বা জবানী এলেম। এটা হলো আল্লাহ পাকের পক্ষ হতে আদম সন্তানদের প্রতি দলিল স্বরূপ।
— মিশকাত শরীফ
আর এ হাদীসের ব্যাখ্যায় মালিকী মজহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম, ইমামুল আইম্মা রঈসুল মুহাদ্দিসীন ফকরুল ফুকাহা শাইখুল উলামা হযরত ইমাম মালিক (রহঃ) বলেন
যে ব্যক্তি এলেম ফিকাহ (জবানী এলেম) অর্জন করলো কিন্তু এলেম তাছাউফ (ক্বালবী) এলেম করলো না সে ব্যক্তি ফাসিক। আর যে ব্যক্তি ইলমে তাছাউফের দাবী করে কিন্তু শরীয়ত স্বীকার করেনা সে ব্যক্তি যিন্দীক (কাফের) আর যে ব্যক্তি উভয় প্রকার এলেম অর্জন করলো সে ব্যক্তি মুহাক্কিক তথা মুমিনে কামেল।
— মিরকাত
অর্থ্যাৎ এলমে ফিকাহ ও এলমে তাছাউফ উভয় প্রকার এলেম অর্জন করতঃ দ্বীনের উপর


0 Comments: