মোরাকাবা অর্থ ধ্যান, গভীর চিন্তা। সুফি বা সাধু সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচলিত বিশেষ এক তন্ময়তা বা সম্মোহিত অবস্থা। জগতের সকল ধর্মের নিগুঢ় ব্যবস্থাপত্র হচ্ছে মোরাকাবা। হযরত রসূল (স.) ১৫ বছর একাধারে হেরা গুহায় ধ্যান বা মোরাকাবা করেছেন। নবীজি (স.) হেরাগুহায় ধ্যান সাধনা করে আপন হূদয়কে আলোকিত করেছেন। তিনি সাধনার সর্বোচ্চ স্তরে উপনিত হয়ে আল্লাহর দিদার পান। রসূল (স.) ফরমান, “আমার প্রভুকে আমি অতি উত্তম সুরতে দেখেছি” (তাফসীরে রুহল বয়ান)। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, ‘বিশ্বনবী (স.) সিদরাতুল মুনতাহার সন্নিকটে আল্লাহ পাকের দর্শন লাভ করেছিলেন” (তিরমিজী)। হযরত আদী ইবনে হাতেম (রা.) কর্তৃক বর্ণিত তিনি বলেন, হযরত নবী করিম (স.) বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে এমন কেহ-ই নেই, যার সাথে অচিরেই তার প্রভু কথাবার্তা বলবেন না। সে সময় প্রভু এবং তার মাঝে কোন দোভাষী কিংবা কোন প্রতিবন্ধক থাকবে না” (বুখারি: ৬৯৩৫)। নবীজি (স.) এর শেখানো পদ্ধতি তাসাওফ চর্চার ফলে সাহাবাগণের অন্তর আলোকিত হয়। তাইতো নবীজি (স.) এরশাদ করেছেন, “সাহাবাগণ নক্ষত্রতুল্য”। মোরাকাবার শিক্ষার বিষয়টি শরীয়তের চর্চার মধ্যে দেখা যায় না। এ শিক্ষা কেবল খাঁটি পীর বা আউলিয়ায়ে কেরামের মজলিসে প্রচলিত আছে। তরীকতে মোরাকাবা ছাড়া সাধনার স্তর অতিক্রম করার কোন বিধান নেই। মোরাকাবা করলে হূদয়ের কালিমা বিদুরিত হয়ে হূদয় আলোকিত হয়। একজন সাধক প্রত্যহ ৫ ধরনের ফায়েজ মোরাকাবার মাধ্যমে কলবে ধারণ করেন। প্রত্যেক নামাজের ওয়াক্তে আলাদাভাবে আল্লাহর পক্ষ থেকে আপন মোর্শেদের সিনাহ হয়ে এ ফায়েজ ওয়ারেদ হয়। ফজরের ওয়াক্তে কুয়াতে এলাহীর ফায়েজ। এ ফায়েজ দ্বারা কলবের ৭০ হাজার পর্দার ভেতরের সমস্ত গুনাহর পাহাড় সাফ হয়। সাফ দিলে জিকিরে আনোয়ারীর ফায়েজ পড়ে কলবে ‘আল্লাহ আল্লাহ’ জিকির জারি হয়। যোহরের ওয়াক্তে হযরত রাসূল (স.) এর মহব্বতের ফায়েজ। এতে নবীজির মহব্বত দিলে ভরপুর হয়। আছর ও মাগরিবের ওয়াক্তে তওবা কবুলিয়াতের ফায়েজ। এ দ্বারা সকল প্রকার গুনাহ মাফ হয়ে দিল পরিষ্কার হয়। এশার ওয়াক্তে গাইরিয়াতের ফায়েজ। এর দ্বারা নফসের কুখায়েশসহ যাবতীয় খারাবি ধ্বংস হয়ে সিজ্জিন জাহান্নামে দফা হয় এবং দিল সাফ হয়। আর রাতের তৃতীয়াংশে রহমতের ওয়াক্তের ফায়েজ। এর ফলে দিল আল্লাহর রহমতে ভরপুর হয়। এভাবে সকল ওয়াক্তের মোরাকাবায় দিলের মধ্যে ফায়েজ পড়ে দিল সাফ হয়। মোরাকাবার জন্য অতি উত্তম সময় হচ্ছে রাতের শেষ প্রহরে রহমতের সময়। এ সময় প্রকৃতি থাকে নিরব, পরিবার পরিজনও থাকেন ঘুমিয়ে। এমন সময়টাই মোরাকাবার জন্য বেছে নেন সাধকগণ। এ সময় আল্লাহপাক বান্দার ডাকে অধিক সাড়া দেন। তিনি বান্দাকে অনুপ্রাণিত করতে থাকেন, তাঁকে ডাকতে বলেন, তাঁর ইবাদত করে তাঁর নৈকট্যলাভের আহ্বান করেন। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত রসুল (স.) বলেছেন, “আমাদের প্রতিপালক প্রতি রাতের যখন শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকে তখন প্রথম আসমানে অবতরণ করেন এবং বলতে থাকেন, হে বান্দা আমার কাছে প্রার্থনা কর, আমি তোমার প্রার্থনা কবুল করব। আমার কাছে তোমার কি চাওয়া আছে, চাও, আমি তা দান করব। আমার কাছে তোমার জীবনের গুনাহর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর, আমি তোমার গুনাহ মাফ করে দেব” (বুখারী : ৬৯৮৬)। মোরাকাবা হল নফল ইবাদত। নফল ইবাদত হল আল্লাহর নৈকট্য লাভের উত্তম পন্থা। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন, “যখন আমার বান্দা নফল ইবাদত দ্বারা আমার নৈকট্য লাভ করে, তখন আমি তাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করি, এমতাবস্থায় আমি তার কর্ণ হই, যদ্বারা সে শ্রবণ করে; আমি তার চক্ষু হই, যদ্বারা সে দর্শন করে; আমি তার হাত হই, যদ্বারা সে ধারণ করে; আমি তার পদযুগল হই, যদ্বারা সে হেঁটে বেড়ায়। এমন অবস্থায় সে আমার কাছে যা কিছু চায় আমি সঙ্গে সঙ্গে তা দান করি” (বুখারি : ৬০৫৮)। তাই মোরাকাবা সাধকের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। মোরাকাবা অন্তরের কালিমাকে পরিস্কার করে দেয়। যার হূদয়ের কালিমা বিদূরিত হয়েছে, সে নামাজে আল্লাহর সাথে কথোপকথন করে। তাই প্রতি ওয়াক্ত নামাজ ও এবাদতের শেষে অন্তত ২ মিনিটের জন্য হলেও নিয়মিত মোরাকাবা অব্যাহত রাখা উচিত। তাহলেই সাধক ধীরে ধীরে আল্লাহর নৈকট্যে পৌঁছে যেতে সক্ষম হবেন। হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, হযরত নবী করিম (স.) তাঁর রবের কাছ থেকে বর্ণনা করেন- আল্লাহ বলেছেন, “বান্দা যখন আমার দিকে এক বিঘত অগ্রসর হয়, আমি তখন তার দিকে এক হাতপরিমাণ অগ্রসর হই। আর সে যখন আমার দিকে এক হাতপরিমাণ অগ্রসর হয়, আমি তার দিকে দু হাত পরিমাণ অগ্রসর হই। আর বান্দা যদি আমার দিকে হেঁটে আসে, আমি তার দিকে দৌড়ে যাই” (বুখারি : ৭০২৮)। মোরাকাবা করার প্রথম শর্ত হল দু‘চোখ বন্ধ করে নেওয়া। অত:পর তরীকতের ওয়াজিফা মোতাবেক ধ্যানে নিমগ্ন হওয়া। জাহেরি দুচোখে বন্ধ করে নামাজের মত বসে খেয়াল কলবে ডুবিয়ে মোরাকাবা করতে হয়। মোরাকাবা করলে কলবের চোখ খুলে যায়। ইবাদতে জাহেরী চোখ বন্ধ করলেই কেবল বাতেনী চোখ খোলে। মোরাকাবা করার প্রারম্ভে দরকার খাঁটি মোর্শেদের সাহচর্য। পবিত্র কোরআনের বহু স্থানে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নিদের্শনা আছে। এরশাদ হয়েছে, “ওহে যারা ঈমান এনেছ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সাদেক্বিনদের বা সত্যবাদীদের সঙ্গী হয়ে যাও” (সূরা তাওবাহ: ১১৯)। মারেফত ছাড়া বাতেনী রাস্তার অনুসন্ধানী হওয়া যায় না। যে কোন বিষয়ে অনুসন্ধানী হলে যেমন বিশাল অর্জন সম্ভব হয়, ঠিক তেমনি আল্লাহর পথের অনুসন্ধানী হলে আল্লাহওয়ালা বা মোমেন হওয়া যায়। মানুষের দিল হচ্ছে মহাভেদ ও বাতেনের দরিয়া। একজন ডুবুরি যেমন গভীর সমুদ্রে ডুব দিয়ে তলদেশ থেকে মণি-মাণিক্য তুলে আনেন, তেমনি মানুষও তার দেলের মধ্যে ডুবে জগতের সবচে মুল্যবান রত্ন আবিষ্কার করতে পারেন। আল্লাহকে পাওয়ার জন্য অনেকগুলো সাধনা রয়েছে, তন্মেধ্যে অন্যতম হচ্ছে মোরাকাবা। সুতরাং মোরাকাবার মাধ্যমেই স্রষ্টা ও সৃষ্টির মাঝের ভেদ ও রহস্য উন্মোচন করা সম্ভব।




0 Comments: